যশোরে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী
বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
যশোরে জনাকীর্ণ জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আজ জুলাই সনদ এবং রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যারা স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল- আমরা ক্ষমা করে দিলাম, যারা স্বৈরাচারের সাথে ঢাকার বাইরে গোপনে মিটিং করে- তারা জনগণের কথা বলছে, না কি যারা জনগণের জন্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকের জন্যে কৃষক কার্ড, বেকারদের জন্যে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে তারা। কোন বিষয়গুলো আপনাদের কাছে জরুরি সেটি বিবেচনা করতে হবে।
একটি রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল, ১৯৯৬ সালেও বিভ্রান্ত করে, ২০০৮ সালে করেছিল। আজ ২০২৬ সালে এসেও সেই একই অপচেষ্টা করছে। আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন, সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচার বিতাড়িত হয়েছে। এখন সময় দেশ গড়ার, দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়ার এবং দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করার।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সোমবার বিকেলে যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে জেলা বিএনপি আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায়ের পর আমরা রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছিলাম। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ হ্যাঁ ও না ভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছে সেই জুলাই সনদ পাস করানোর। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি, বিএনপি সেই সনদের প্রত্যেকটি শব্দ, প্রত্যেকটি লাইন জাতীয় সংসদে পাস করবে।
তিনি দেশবাসীকে উদ্দেশ করে বলেন, আমাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কেউ এই দেশে আর কোনো বিশৃঙ্খলা করতে না পারে। জনগণের শান্তি বিঘ্ন করে আবারও ১৭৩ দিনের হরতাল করতে চাইলে আমরা তাদের সেই সুযোগ দেবো না। কোনো জুজুবুড়ির ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে পিছিয়ে রাখা যাবে না।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, একটি গোষ্ঠী মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করতে। তারা নির্বাচনের আগে বায়বীয় টিকিট বিক্রি। আমরা কোনো টিকিট বিক্রি করি না। সেকারণে দেশের মানুষ শহীদ জিয়ার দল, বেগম খালেদা জিয়ার দল বিএিপিকে ভোটে নির্বাচিত করেছে কাজ করার জন্যে। আমরা কাজে বিশ্বাসী। কেননা আল্লাহ পাক বলেছেন, যারা নিজেরা পরিশ্রম করে, আমি তাদের সহায়তা করি।
নারীশিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের বতৃমান জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি, যার অর্ধেকই নারী। দেশের এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে দেশের উন্নয়ন কিংবা সানে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এই জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করতে, তাদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি করতে বর্তমান সরকার নারীদের ডিগ্রি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং কৃতি শিক্ষার্থীদের জন্যে বৃত্তির ব্যবস্থা করবে।
তিনি বলেন, আমাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান শুরু করেছি। পর্যায়ক্রমে এ কার্ড হাজার, সেখান থেকে রাখ এবং শেষে তা কোটিতে পৌঁছাবে। আমরা দুইদিন আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছি মেয়েদের রান্না কষ্ট লাঘব করতে ফ্যামিলি কার্ডের মতো এলপিজি (গ্যাস) কার্ডের ব্যবস্থাও করবো, যাতে রান্না করতে গিয়ে আমাদের মা-বোনদের যেনো কষ্ট না হয়। আমরা কৃষকদের ১০ হাজার টাকার কৃষিঋণ সৃদসহ মওকুফের কথা বলেছিলাম, সেটি শুরু করেছি। যার সুফল পাবেন দেশের প্রায় ১২ লাখ কৃষক। এছাড়া কৃষকদের জন্যে কৃষক কার্ড প্রদানও শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আমরা আমাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।
তিনি বিরোধীদলের উদ্দেশ করে বলেন, আপনারা অপেক্ষা করেন। আগামীতে যদি দেশের মানুষ অপনাদের প্রতি আস্থা রাখে, আপনাদের নির্বাচিত করে- তাহলে আপনারা তখন আপনাদের কাজ করবেন। এখন জনগণ পাঁচ বছরের জন্যে আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে, এখন বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পাশাপশি জাতীয় প্রতিশ্রতি জুলাই সনদও বাস্তবায়ন করবে।
জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী অ্যানি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার শাখাওয়াত হেসেন বকুল, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এমপি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু, কেন্দ্রীয় সদস্য ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ূব, সাবেরা সুলতানা মুন্নী, আবুল হোসেন আজাদ, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মুনীর আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু, নগর বিএনপির সভাপতি বিপ্লব চৌধুরী মুল্লুকচাঁদ, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক খোকন, জেলা যুবদলের সভাপতি এম তমাল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক আনছারুল হক রানা, স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মোস্তফা আমির ফয়সাল, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান বাপ্পী প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী সোমবার দিনভর যশোরে নানা কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় পার করেন। সকালে ঢাকা থেকে যশোর বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে সোজা চলে যান শার্শার উলাশীতে। সেখানে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনর্খনন কাজ উদ্বোধন করেন তিনি। সেখান থেকে অসেন যশোর মেডিকেল কলেজে। সেখানে তিনি ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে যান ঐতিহ্যবাহী যশোরা ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শনে। এরপর যশোরে সার্কিট হাউজে দুপুরের খাবার গ্রহণ এবং বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে জনসভাস্থলে যান। জনসভায় তিনি প্রায় আধাঘণ্টা বক্তব্য রাখেন।