প্রয়াত পিতৃপুরুষের আত্মার শান্তিকামনায় তিলতর্পণ
শাহীন সানি
, যশোর
মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার আবাহনের মধ্যদিয়ে শুরু হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের পুণ্যলগ্ন। শুভ মহালয়ার পুণ্যতিথিতে বিশেষ পূজা, চণ্ডীপাঠ ও আরতির মাধ্যমে দেবীকে সপরিবারে মর্ত্যলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর মধ্যদিয়েই অবসান হলো কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকারময় (পিতৃপক্ষ) এবং সূচনা হলো আলোকময় (দেবীপক্ষ)। শুরু হলো দুর্গোৎসবের আনন্দময় ক্ষণগণনা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) ভোরের আলো ফোটার আগেই যশোরের ৭৩৭টি মন্দির ও পূজামণ্ডপে উলুধ্বনি, শঙ্খনাদ আর মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যদিয়ে মহালয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এ উপলক্ষে জেলার প্রধান ও বৃহৎ আয়োজনটি করা হয় যশোর কালেক্টরেট পুকুরপাড়ে।
সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানমালার সূচনা হয় গীতিআলেখ্য ও চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে। এরপর শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শত শত ভক্ত শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
তিলতর্পণ ও পিতৃপক্ষের ধর্মীয় বিধান:
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, মহালয়ার এই পুণ্যলগ্নে পরলোকগত পূর্বপুরুষদের (পিতৃপুরুষ) আত্মা মর্ত্যলোকের কাছাকাছি অবস্থান করে। তাঁদের তৃপ্তির জন্য জল ও তিল দান করে এই বিশেষ প্রার্থনা করা হয়, যাকে ‘তিলতর্পণ’ বলা হয়। ভক্তরা পরনে ভেজা কাপড় জড়িয়ে অঞ্জলি প্রদানের মাধ্যমে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের বিদেহী আত্মার শান্তি ও স্বর্গীয় মুক্তি কামনা করেন।
হিন্দু শাস্ত্রমতে, এই তিথিতে তর্পণ করলে পিতৃপুরুষের আত্মা তৃপ্ত হন এবং বংশধরদের আশীর্বাদ প্রদান করেন।
চলতি বছর দেবীর গজে (হাতি) আগমন ও নৌকায় গমন:
পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, মহালয়ার দিনেই কৈলাস শিখর থেকে দেবী দুর্গা তাঁর চার সন্তান—কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে সঙ্গে নিয়ে মর্ত্যে পিতৃগৃহের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। অশুভ ও আসুরিক শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে পৃথিবীতে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই দেবীর এই মর্ত্যে আগমন।
সনাতন শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা মতে, এ বছর দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘটছে গজে (হাতি)। গজে আগমনের ফল হিসেবে ধরায় শান্তি, সমৃদ্ধি ও শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা বিরাজ করবে। অন্যদিকে, উৎসব শেষে বিজয়া দশমীতে দেবীর গমন হবে নৌকায়। নৌকায় গমনের ফলে পৃথিবীতে জলবৃদ্ধি এবং অতিবৃষ্টির যোগ থাকলেও ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে দেবী ধরণীকে আশিসধন্য করে যাবেন।
দুর্গোৎসবের নির্ঘণ্ট:
শরৎকালের এই শারদীয় দুর্গাপূজা মূলত ‘অকালবোধন’ হিসেবে পরিচিত, যা ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র রাবণের বধের উদ্দেশ্যে দেবী দুর্গার আরাধনা করে শুরু করেছিলেন। পঞ্জিকা মতে, আগামী ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী পূজার মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল পর্ব। এরপর ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাঅষ্টমী ও সন্ধিপূজা এবং ২০ অক্টোবর মহানবমীর শাস্ত্রীয় বিধান সম্পন্ন করা হবে।
আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে সিঁদুর উৎসব ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে সম্পন্ন হবে পাঁচ দিনব্যাপী এই আনন্দ উৎসব।