সুবর্ণভূমি ডেস্ক
রবীন্দ্রনাথ খাজনা বৃদ্ধি করেছেন। প্রজাদের নির্যাতন করেছেন। যেই জমিদার আমাদের কৃষির সারপ্লাস নিয়া গেসে কোলকাতায়। আমাদের ক্যাপিটালিস্ট রিফর্ম পিছায়ে দিসে শত বছর। এভাবে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে লিখেছেন শীর্ষস্থানীয় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও ইনফ্লুয়েন্সার পিনাকী ভট্টাচার্য্য। তার লেখাটি সুবর্ণভূমির পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:
গতকাল রবীন্দ্রনাথ নিয়া আমার পোস্টে একজন মন্তব্য করসেন: কমিউনিস্ট পার্টির একজন সাবেক নেতার কী অধঃপতন! আমি এই কমেন্টের জবাব দিতে চাই আমার কমিউনিস্ট পরিচয় নিয়াই, কারণ অধঃপতনটা আসলে উল্টা দিকে ঘটসে। বাঙ্গু বামপন্থীরাই পথভ্রষ্ট। সে তার পলিটিক্যাল ট্রেনিং করে নাই। হুইন্যা মুসলমানের মতো সেও হুইন্যা কমিউনিস্ট।
বিনয়ের সাথে কই, সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথরে নিয়া আমার চাইতে বেশি পড়াশোনা সম্ভবত কেউ করে নাই: উনার নিজের লেখা, উনারে নিয়া লেখা, সব মিলায়া। রবীন্দ্রনাথের লেখার ভিতরের দর্শন নিয়া আমি আলাদা বই লিখসি, গান আর কবিতা খুইল্যা খুইল্যা তার দর্শন দেখাইসি। আমার আগে কেউ করে নাই, দুই বাংলা ধইর্যা হিসাব করতে পারেন। আমি এই রবীন্দ্র ঘরানার ভিতরেই বড় হইসি। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথরে জনপ্রিয় করার পিছনের মানুষ ওয়াহিদুল হক, আর আমি আছিলাম তার একনিষ্ঠ চ্যালা। তাই রবীন্দ্রনাথরে না পইড়া আমি এই কথা কইতেসি না। পইড়া কইতেসি, গভীরভাবে বুইঝ্যা কইতেসি।
রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের সমস্যা তার সাহিত্য নিয়া যতটুকু, তার চাইতে অনেক বেশি তার শ্রেণি নিয়া। মার্ক্সবাদের প্রথম পাঠ হইল, মানুষরে বিচার করতে হয় উৎপাদন সম্পর্কে তার জায়গা দিয়া, তার মনের সৌন্দর্য দিয়া না। যেই কমিউনিস্ট জমিদারের পূজা করে, সে মার্ক্স পড়ে নাই, শুধু গীতবিতান পড়সে। একজন ট্রেইনড লেফটিস্ট কখনো রবীন্দ্রনাথের ভক্ত হইতে পারে না। ভক্ত হইলে বুঝতে হইবো, তার ট্রেনিংয়ে ফাঁক আছে।
ঠাকুরবাড়ির জমিদারি আছিল কুষ্টিয়ার বিরাহিমপুর পরগনায়, সদর দপ্তর শিলাইদহে। ওই এলাকায় প্রজাপীড়নের অভিযোগ ছিল দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমল থেইক্যা, আর দেবেন্দ্রনাথের সময় তা মাত্রা ছাড়ায়: খাজনা বৃদ্ধি, নানা আবওয়াব, ভিটা থেইক্যা উচ্ছেদ, খরা-বন্যায় বিপন্ন রায়তের কাছ থেইক্যা জোর কইর্যা খাজনা আদায়। এই খবরগুলা ছাপতেন কুমারখালীর কাঙাল হরিনাথ, তার "গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা"য়। ঠাকুর-জমিদাররা প্রথমে টাকা দিয়া তারে কিনতে চাইসিল, না পাইরা লাঠিয়াল পাঠাইসে। তখন হরিনাথরে বাঁচাইতে কে আগায়া আসছিল? লালন ফকির, দলবল নিয়া, নিজের হাতে লাঠি ধইর্যা।
জমিদারির ভার রবীন্দ্রনাথের উপর আসে ১৮৯০ সালে, বিলাত থেইক্যা ফিরার পর। কিন্তু জমিদারি কারো ব্যক্তিগত চরিত্র না, জমিদারি একটা সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ উত্তরাধিকার সূত্রে পাইসিলেন খাজনার খাতা, কাছারি, নায়েব-গোমস্তা, আর পদ্মায় জমিদারের বজরা। ওই বজরায় বইস্যা বাংলা সাহিত্যের অনেক কিছু লেখা হইসে। বজরার তলার পানির পাড়ে যারা খাজনা গুনসে, তারা আমাগো দাদা-পরদাদা।
এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মেরুদণ্ড এই রায়তরাই। পূর্ববঙ্গ জমিদার উচ্ছেদ কইর্যাই রাষ্ট্র হওয়ার রাস্তায় হাঁটসে। বাংলাদেশ প্রজার রাষ্ট্র। প্রজার রাষ্ট্রে জমিদার কবি প্রতিবেশী হইতে পারেন, পাঠ্য হইতে পারেন, কিন্তু জাতির আকাঙ্ক্ষা হইতে পারেন না। আমাদের কাছে তিনি একজন বাংলাভাষী বিদেশি কবি।
রবীন্দ্রনাথ নিয়া আমাদের যেই সমস্যা তার প্যারালাল আছে আলজেরিয়ায়। আলবেয়ার কামু আলজেরিয়ায় জন্মাইসেন, ফরাসি ভাষায় লিখসেন, নোবেল পাইসেন। তার লেখায় আলজেরিয়ার রোদ, সমুদ্র, শহর ভরা। তবু আলজেরিয়ার মানুষ আজো তারে পুরাপুরি আপন করতে পারে না। কেউ তারে নিজের লেখক কয়, কেউ খারিজ করে। খারিজ করার কারণ তার সাহিত্য না, তার অবস্থান। আলজেরিয়ার মানুষ যখন ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধ করতেসে, কামু দাঁড়াইসিলেন ফরাসিদের পক্ষে, কলোনি মাস্টারের পক্ষে, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। তার মনে দয়া আছিল, আরবদের দুঃখ নিয়া লিখসেনও। কিন্তু যেই ব্যবস্থা আরবদের দুঃখ পয়দা করতেসিল, সেই ব্যবস্থা ভাঙার পক্ষে তিনি দাঁড়ান নাই।
রবীন্দ্রনাথও তাই। পূর্ববঙ্গের নদী, আকাশ, মেঘ তার লেখায় আছে। হয়তো প্রজার প্রতি দয়াও আছে। কিন্তু রায়ত আর জমিদারের লড়াইয়ে তিনি কোন দিকে দাঁড়াইবেন, সেইটা তার বাছাই করার সুযোগই ছিল না, কারণ খাজনার খাতাটা তার নিজের। কামুর সমস্যা যেমন আলজেরিয়ার কাছে উপনিবেশ, রবীন্দ্রনাথের সমস্যা আমাদের কাছে জমিদারি। দুইজনই দয়ালু, দুইজনই প্রতিভাবান, আর দুইজনই সেই জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের ভুল পাশে দাঁড়ানো।
কামু তো তাও আলজেরিয়ার মাটিতে জন্মাইসিলেন। রবীন্দ্রনাথ এই মাটিতে জন্মান নাই, আসছিলেন বজরায় চইড়া, খাজনা তুলতে।
কামুর সবচাইতে বিখ্যাত উপন্যাস "দ্য স্ট্রেঞ্জার"। পুরা ঘটনা ঘোরে এক আরবরে নিয়া, অথচ উপন্যাসে সেই আরবের কোনো নাম নাই। সত্তর বছর পর আলজেরিয়ার লেখক কামেল দাউদ সেই আরবরে একটা নাম দিসেন, মুসা, আর তার একটা পরিবার দিসেন। আলজেরিয়া এইভাবে জবাব দিসে: তোমার গল্পে আমাদের মানুষ শুধু পটভূমি আছিল, আমরা তারে নাম ফিরায়া দিলাম। আমাদের মুসারা কারা? পাবনার বিদ্রোহী রায়ত, শিলাইদহের উচ্ছেদ হওয়া প্রজা, খরার বছরে জোর কইর্যা খাজনা দেওয়া চাষী। তাদের নাম লিখা রাখসিলেন কাঙাল হরিনাথ। আমরা সেই নামগুলা ভুইল্যা গেসি, আর বজরার কবির নাম মুখস্থ করসি।
রবীন্দ্রনাথ হিন্দু, এইটা বাংলাদেশের সমস্যা না। হিন্দু হওয়া কারো অপরাধ না। কিন্তু জমিদার হওয়া একটা শ্রেণি অবস্থান, একটা ক্লাস পজিশন। আর সেই শ্রেণী অবস্থানের বিচার করার অধিকার রায়তের নাতিপুতির আছে। কাঙাল হরিনাথও হিন্দু। কিন্তু সে আমাদের ইতিহাসের রাস্তায় দাঁড়ানো আমাদেরই সাথে।
আমাদের লজ্জা যে, এই প্রজার রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত লেখা হইসে জমিদারের কলমে। যেই জমিদার আমাদের কৃষির সারপ্লাস নিয়া গেসে কোলকাতায়। আমাদের ক্যাপিটালিস্ট রিফর্ম পিছায়ে দিসে শত বছর। বাঙ্গুরা গীতাঞ্জলি দেখে, নোবেল দেখে, শান্তিনিকেতন দেখে।
প্রজার শতাব্দীর কান্না শোনে না।