ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা কেবল খেলার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে মানবিক ট্র্যাজেডির প্রতীক। কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার সেই নামগুলোর অন্যতম। ১৯৯৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপে একটি আত্মঘাতী গোলের কারণে সমালোচনার মুখে পড়া এই ফুটবলার মাত্র দশ দিন পর নিজ দেশে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন। এরপর থেকেই তিনি পরিচিত হন ফুটবল বিশ্বের ‘ট্র্যাজিক হিরো’ হিসেবে।
কলম্বিয়ার স্বপ্নের দল
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে কলম্বিয়া ছিল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল দল। কার্লোস ভালদেরামা, ফাউস্তিনো আসপ্রিয়া, ফ্রেডি রিঙ্কন ও আন্দ্রেস এসকোবারদের নিয়ে গড়া দলটিকে ১৯৯৪ বিশ্বকাপের অন্যতম সম্ভাব্য শিরোপাপ্রত্যাশী হিসেবে ধরা হচ্ছিল।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কলম্বিয়া আর্জেন্টিনাকে তাদের মাঠে ৫-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। সেই সাফল্যের পর প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সেই আত্মঘাতী গোল
১৯৯৪ সালের ২২ জুন, যুক্তরাষ্ট্রের পাসাডেনার রোজ বোল স্টেডিয়ামে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হয় কলম্বিয়া।
ম্যাচের ৩৫তম মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের জন হার্কসের ক্রস ঠেকাতে গিয়ে আন্দ্রেস এসকোবারের পা থেকে বল জড়িয়ে যায় নিজের দলের জালে। আত্মঘাতী সেই গোলেই এগিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয়। এই পরাজয়ের ফলে কলম্বিয়ার দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার সম্ভাবনা বড় ধাক্কা খায়। পরে সুইজারল্যান্ডকে হারালেও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় দলটিকে।
দেশে ফিরে ক্ষমা চেয়ে লেখা
বিশ্বকাপ থেকে ফেরার পর আন্দ্রেস এসকোবার ভেঙে পড়েননি। বরং তিনি কলম্বিয়ার একটি পত্রিকায় একটি আবেগঘন নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে জীবন ও ফুটবল- দুটোই এগিয়ে যাবে।
তার লেখার শেষের কথাগুলো আজও স্মরণীয়: ‘জীবন এখানেই শেষ নয়। সামনে আরও অনেক কিছু অপেক্ষা করছে।’
দুঃখজনকভাবে, এই কথাগুলো লেখার কয়েক দিনের মধ্যেই তার জীবন সত্যিই শেষ হয়ে যায়।
নির্মম হত্যাকাণ্ড
১৯৯৪ সালের ২ জুলাই, কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরের একটি নাইটক্লাব থেকে বের হওয়ার পর কিছু লোকের সঙ্গে তার তর্কাতর্কি হয়।
একপর্যায়ে দেহরক্ষী হুম্বের্তো মুনিয়োস কাস্ত্রো তাকে কাছ থেকে গুলি করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাকে ছয়টি গুলি করা হয়। হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে বাঁচাতে পারেননি।
তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর।
কেন হত্যা করা হয়েছিল?
তদন্তে উঠে আসে, হত্যার পেছনে ব্যক্তিগত উত্তেজনার পাশাপাশি বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষোভও ভূমিকা রেখেছিল। সে সময় কলম্বিয়ায় মাদকচক্রের অর্থে অবৈধ জুয়া ও বাজির বিস্তার ছিল। বিশ্বকাপে দলের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ে অনেকের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল।
তবে হত্যার পেছনে একক কারণ নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, ফুটবলের হতাশা, ব্যক্তিগত বিরোধ এবং সেই সময়ের সহিংস সামাজিক বাস্তবতা- সব মিলিয়েই এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম দেয়।
বিচার
হত্যাকারী হুম্বের্তো মুনিয়োস কাস্ত্রো গ্রেপ্তার হন। আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেন। পরে কলম্বিয়ার আইন অনুযায়ী সাজা কমিয়ে দেওয়া হয় এবং তিনি প্রায় ১১ বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান।
আজও অমর এক নাম
আন্দ্রেস এসকোবারকে আজও কলম্বিয়ার অন্যতম সম্মানিত ফুটবলার হিসেবে স্মরণ করা হয়। তার সততা, ভদ্রতা ও নেতৃত্বের জন্য তাকে ডাকা হতো ‘এল কাবায়েরো দেল ফুটবল’ অর্থাৎ ‘ফুটবলের ভদ্রলোক’।
তার মৃত্যু ফুটবল বিশ্বকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে- একটি ভুল কখনোই একজন খেলোয়াড়ের জীবন কেড়ে নেওয়ার কারণ হতে পারে না। খেলাধুলায় জয়-পরাজয় থাকবে, কিন্তু মানবজীবনের মূল্য তার চেয়ে অনেক বড়।
আন্দ্রেস এসকোবারের কাহিনি তাই শুধু একটি আত্মঘাতী গোলের গল্প নয়; এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক এবং হৃদয়বিদারক অধ্যায়গুলোর একটি।
লেখক: ক্রীড়ালেখক