তসলিম শিমুল
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী পর্তুগালকে কঠিন লড়াইয়ের মুখে ফেলে আলোচনায় এসেছে ডিআর কঙ্গো। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের মূলপর্বে ফিরে আফ্রিকার দলটি দেখিয়ে দিয়েছে, তারা সহজ প্রতিপক্ষ নয়। তবে কঙ্গোর বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমন এক অধ্যায় রয়েছে, যেখানে ফুটবলারদের শুধু ম্যাচ জেতার জন্য নয়, নিজেদের জীবন বাঁচাতেও মাঠে নামতে হয়েছিল।
ঘটনাটি ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপের। তখন দেশটির নাম ছিল জাইরে। সেই সময় দেশের শাসক ছিলেন একনায়ক প্রেসিডেন্ট মোবুতু সেসে সেকো। ১৯৬৫ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি ফুটবলকে জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। দেশের ফুটবলের উন্নয়নে বিপুল অর্থ বিনিয়োগও করেছিলেন তিনি।
জাইরে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় ১৯৭৪ সালে। কিন্তু বিশ্বকাপের শুরুটা ভালো হয়নি। প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ২-০ গোলে হারের পর ক্ষুব্ধ হয়ে প্রেসিডেন্ট মোবুতু খেলোয়াড়দের বেতন বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন।
এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ফুটবলাররা বিশ্বকাপে আর খেলবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই অবস্থান মেনে নেননি মোবুতু। অধিনায়ককে ফোন করে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেন। শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নামে জাইরে এবং যুগোস্লাভিয়ার কাছে ৯-০ গোলের বড় ব্যবধানে হেরে যায়।
এই ভরাডুবির পর মোবুতু নিজেই ড্রেসিংরুমে গিয়ে খেলোয়াড়দের কড়া হুঁশিয়ারি দেন। তিনি জানিয়ে দেন, পরের ম্যাচে যদি দল তিন গোলের বেশি ব্যবধানে হারে, তাহলে কাউকে দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না। এমনকি হোটেল থেকেও বের হতে দেওয়া হবে না।
এরপর ব্রাজিলের বিপক্ষে কার্যত জীবন হাতে নিয়েই মাঠে নামে জাইরের ফুটবলাররা। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল তিন গোলের বেশি না খাওয়া। শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল ৩-০ ব্যবধানে জিতলেও, সেই ফলই খেলোয়াড়দের দেশে ফেরার সুযোগ করে দেয়।
ঘটনার প্রায় ২৮ বছর পর জাইরের সাবেক ডিফেন্ডার এম্পেউ ইলুঙ্গা সেই ম্যাচের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ব্রাজিল ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময় একটি ফ্রি-কিক পায়। সেই শট থেকে আরেকটি গোল হয়ে গেলে দলের সদস্যদের জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারতো।
এ কারণেই ব্রাজিল ফ্রি-কিক নেওয়ার আগেই ইলুঙ্গা দৌড়ে গিয়ে বলে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দেন। নিয়ম ভাঙার কারণে তিনি হলুদ কার্ড দেখেন। সে সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, জাইরের খেলোয়াড়রা হয়তো ফুটবলের নিয়ম জানতেন না। কিন্তু বাস্তবে সেটি ছিল পুরো দলের জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা।
বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি জাইরের ফুটবলারদের। প্রেসিডেন্ট মোবুতু তাদের আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেন এবং বিদেশে খেলতে যাওয়ার পথও কার্যত বন্ধ করে দেন। ফলে ইউরোপীয় ক্লাবে খেলার সম্ভাবনাও হারিয়ে ফেলেন তারা।
১৯৭৪ সালের সেই বিশ্বকাপ আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়, যেখানে একটি দলের জন্য একটি গোলের ব্যবধানই জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
লেখক: ক্রীড়ালেখক