লিওনেল মেসি শুধু ফুটবল মাঠেই নন, মাঠের বাইরেও মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার মতো প্রভাব রাখেন। ২০২৩ সালে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি শহরে তার উপস্থিতি যেন নতুন এক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জোয়ার তৈরি করেছে। জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ, এক সাধারণ নরসুন্দর এবং একজন দেয়ালচিত্র শিল্পী- সবাই মেসির কারণে পেয়েছেন বিশ্বজুড়ে পরিচিতি।
দ্য অ্যাথলেটিক-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মায়ামি বিচের ইতালীয় রেস্তোরাঁ ক্যাফে প্রিমা পাস্তা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মেসির পরিবারের প্রিয় খাবারের জায়গা। তবে ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই মেসির এক নৈশভোজ রেস্তোরাঁটিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে।
রেস্তোরাঁর ৩০ বছর বয়সী বারটেন্ডার অ্যাঞ্জেলো অ্যাক্সিওন জানান, সেদিন কোনো বাড়তি নিরাপত্তা বা আড়ম্বর ছাড়াই মেসি সাধারণ অতিথির মতো মূল দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। শুরুতে অনেকেই তাকে চিনতে পারেননি। পরে খবর ছড়িয়ে পড়তেই একনজর দেখার জন্য রেস্তোরাঁর বাইরে ভিড় জমে যায়।
রেস্তোরাঁর ৫৭ বছর বয়সী মালিক সিয়া জানান, গত ১২ বছর ধরে মেসি ও তার পরিবার নিয়মিত সেখানে আসছেন। কখনও কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। তার ভাষায়, মেসি অত্যন্ত বিনয়ী ও হাসিখুশি মানুষ। রেস্তোরাঁয় এলে তার সবচেয়ে প্রিয় খাবার রিকোটা চিজ, পালং শাক ও পিঙ্ক সসে তৈরি ‘অ্যাগনলোটি রোসো’ পাস্তা। মালিকের সংগ্রহে লেনি ক্রাভিটজ, এরিক ক্ল্যাপটনসহ বহু তারকার স্বাক্ষর করা গিটার থাকলেও, এখন তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মেসির স্বাক্ষর করা একটি গিবসন গিটার।
মেসির ব্যক্তিগত নরসুন্দর
মেসির কারণে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসা মানুষদের একজন লুইস আন্দ্রেস রিভেরা, যিনি সামাজিক মাধ্যমে ‘এল বোরি বারবার’ নামে পরিচিত। ২৯ বছর বয়সী এই পুয়ের্তো রিকান তরুণ বর্তমানে মেসির ব্যক্তিগত হেয়ার স্টাইলিস্ট।
মায়ামির উইনউড এলাকায় তার আধুনিক সেলুনে এখন প্রতিদিনই ভিড় লেগে থাকে। মেসির সঙ্গে গোপনীয়তা চুক্তি থাকায় তিনি কাজের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেন না। তবে গত আগস্টে মেসির চুল কাটার পর তার সঙ্গে তোলা একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ হতেই রাতারাতি পরিচিতি পান রিভেরা।
বহু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সাক্ষাৎকার নিতে চাইলেও তিনি বেশিরভাগ অনুরোধ ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে বন্ধুদের কাছে মেসির পাঠানো হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা দেখাতে তিনি গর্ববোধ করেন। রিভেরার ভাষায়, ‘মায়ামি আমার জীবন বদলে দিয়েছে। কঠোর পরিশ্রম আর শৃঙ্খলা থাকলে এখান থেকে যে কেউ সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারে।’
দেয়ালচিত্রে বিশ্বজয়ী মেসি
মেসির আগমনে নতুন জীবন পেয়েছেন আর্জেন্টাইন দেয়ালচিত্র শিল্পী ম্যাসিমিলিয়ানো বাগনাস্কোও। ২০২৩ সালে তিনি মায়ামিতে ইন্টার মায়ামির জার্সি পরা হাস্যোজ্জ্বল মেসির বিশাল এক দেয়ালচিত্র আঁকেন, যা দ্রুতই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
বিশেষ আকর্ষণ ছিল, ইন্টার মায়ামির সহ-মালিক ডেভিড বেকহ্যাম নিজে ক্রেনে উঠে সেই শিল্পকর্ম পরিদর্শন করেন। বহুতল ভবনের মালিক গুস্তাভো মিকুলিতস্কি বলেন, দুই দশক ধরে মায়ামিতে বসবাসের অভিজ্ঞতায় তারা জানতেন, মেসি মানুষের আবেগকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন।
বর্তমানে মায়ামির বিভিন্ন কফি শপ, রেস্তোরাঁ কিংবা বড় ছেলে থিয়াগোর ফুটবল অ্যাকাডেমির বন্ধুদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে মেসিকে দেখা এখন শহরবাসীর কাছে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছে।
একসময় বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে পরিচিত মেসি এখন মায়ামির মানুষের কাছেও হয়ে উঠেছেন আপনজন। তার উপস্থিতিকে ঘিরেই শহরটিতে তৈরি হয়েছে নতুন এক রূপকথা, যেখানে একজন ফুটবল তারকা বদলে দিচ্ছেন শুধু একটি ক্লাব নয়, বদলে দিচ্ছেন অসংখ্য সাধারণ মানুষের জীবনও।