তসলিম শিমুল
ফুটবল এমন এক ভাষা, যা দেশ, সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা ভাষার বিভাজনকে মুহূর্তেই মুছে দিতে পারে। সেই সত্যেরই উজ্জ্বল উদাহরণ স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল। অভিবাসী পরিবারের আর্থিক সংগ্রাম, উদ্বাস্তু অধ্যুষিত শিবিরে বেড়ে ওঠা আর বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি জয় করেছেন ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মান- ফিফা বিশ্বকাপ।
ইয়ামালের পুরো নাম লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। স্পেনের নামকরণের নিয়ম অনুযায়ী তার নামের শেষের দুটি অংশ এসেছে বাবা ও মায়ের পদবি থেকে। ‘নাসরাউই’ বাবার পরিবারকে এবং ‘এবানা’ মায়ের বংশপরিচয়কে বহন করে। ‘লামিনে’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘আল-আমিন’ থেকে, যার অর্থ বিশ্বস্ত বা সৎ। আর ‘ইয়ামাল’ শব্দটির উৎস আরবি ‘জামাল’, যার অর্থ সৌন্দর্য।
তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোর নাগরিক এবং মা শেইলা এবানা গিনির বাসিন্দা। ইয়ামালের জন্মের সময় পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে ছিল। সংসার চালানোই ছিল কঠিন। এমন সময় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু লামিনে ও ইয়ামাল। আর্থিক ও মানসিক সহায়তার সেই অবদান স্মরণীয় করে রাখতেই বাবা-মা তাদের প্রথম সন্তানের নাম রাখেন এই দুই বন্ধুর নাম মিলিয়ে- ‘লামিনে ইয়ামাল’।
জন্মের মাত্র পাঁচ মাস পরেই লিওনেল মেসির কোলে ওঠার একটি ছবি সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। তবে ছোটবেলায়ই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে জীবনে নতুন সংগ্রাম শুরু হয় ইয়ামালের। তিনি মায়ের কাছে বড় হলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলেছিলেন তার বাবা।
সংসারের অভাব এতটাই প্রকট ছিল যে, ছেলের জন্য এক জোড়া ফুটবল বুটও কিনতে পারেননি মুনির নাসরাউই। দিনমজুর হিসেবে কাজ করা বাবা স্থানীয় এক জুতো ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ধার করে ছেলের জন্য বুট এনে দিয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, একদিন তার ছেলে বড় ফুটবলার হয়ে সেই টাকা শোধ করবে। আজকের ইয়ামাল চাইলে সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানাই কিনে নেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। তবু বাবার সেই ত্যাগ তিনি কখনো ভোলেননি।
বিশ্বকাপ চলাকালে বাবাকে স্টেডিয়ামে না দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে। পরে ইয়ামাল জানান, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার বাবা যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন শহরে ভ্রমণ করতে পারেননি।
মাত্র ১২ বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন ইয়ামাল। সেখান থেকেই শুরু হয় তার পেশাদার ফুটবল জীবনের উত্থান। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত তরুণ ফুটবলার হয়ে ওঠেন।
তবে সাফল্যের শিখরে উঠেও নিজের শেকড় ভুলে যাননি এই স্প্যানিশ তারকা। তার হাতের একটি আঙুলে লেখা রয়েছে ৩০৪- যা বার্সেলোনার কাছের মাতারো শহরের অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকা রোকাফোন্দার পোস্টকোডের শেষ তিনটি সংখ্যা। গোল করার পর প্রায়ই এই সংখ্যাটি দেখিয়ে নিজের শৈশবের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি।
আজ সেই রোকাফোন্দার রাস্তায় ইয়ামালের ছবিসম্বলিত পোস্টার শোভা পাচ্ছে। এলাকার মানুষের কাছে জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তাদেরই এক সন্তানের বিশ্বজয়ের গল্প। প্রতিদিনের মতো সেখানে এখনো ফুটবল গড়ায়। আর দূরে বসে সেই দৃশ্য দেখেন ইয়ামালের দাদি ফাতিমা নাসরাউই ও তার কিশোর চাচাতো ভাই রায়ান। পরিবারের গর্বের সেই মুহূর্ত তাদের চোখে এনে দেয় আনন্দের অশ্রু।
বিশ্বকাপে ইয়ামালের মাথায় দেখা গেছে ‘রোকাফোন্দা’ লেখা হেডব্যান্ড। তার বুটে ছিল বাবা-মায়ের জন্মভূমি মরক্কো ও গিনির পতাকার প্রতীক। এর মাধ্যমে তিনি বারবার জানিয়ে দিয়েছেন, সাফল্য যত বড়ই হোক, নিজের শেকড় কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
ইয়ামালের বিশ্বাস, ফুটবল এমন এক শক্তি যা ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একই সুতোয় বেঁধে রাখতে পারে। ফলাফল, সীমান্ত কিংবা বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে এই খেলাই মানুষকে একত্রিত করে।
উদ্বাস্তু অধ্যুষিত একটি কলোনি থেকে বিশ্বকাপজয়ী হওয়ার এই গল্প শুধু একজন ফুটবলারের নয়; এটি অধ্যবসায়, পারিবারিক ত্যাগ, কৃতজ্ঞতা এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক অনন্য জীবনকাহিনি। মাত্র ১৯ বছর বয়সে লামিনে ইয়ামাল প্রমাণ করেছেন, প্রতিকূলতা যত বড়ই হোক, অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে বিশ্বজয়ও অসম্ভব নয়।