তসলিম শিমুল
নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২২ সালের রূপকথার পুনরাবৃত্তি হলো না। বরং এই স্টেডিয়াম আবারও লিওনেল মেসির কাছে ব্যর্থতা আর বেদনার প্রতীক হয়ে রইলো। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে স্পেন। ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো লা রোহা, আর টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল মেসিদের।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলের দেখা না পেলেও ম্যাচের বেশির ভাগ সময় বলের দখল, আক্রমণ এবং ছন্দের দিক থেকে ঢের এগিয়ে ছিল স্পেন। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে অবশেষে ভাঙে অচলাবস্থা। শেষ পর্যন্ত সেই গোলই নির্ধারণ করে দেয় বিশ্বকাপের ভাগ্য।
পুরো ম্যাচে স্পেন একের পর এক আক্রমণ শানালেও আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ সময় ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। একাধিক দুর্দান্ত সেভে তিনি স্পেনকে হতাশ করেন। নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে লামিনে ইয়ামালের বাঁক নেওয়া ফ্রি-কিকও অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন তিনি। ফাইনালে সর্বাধিক সেভের নতুন রেকর্ডও গড়েন এমি। তবে অতিরিক্ত সময়ে তোরেসের শট আর ঠেকাতে পারেননি।
স্পেনের দুটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। বিশেষ করে নিকো উইলিয়ামসের একটি গোল বাতিল হওয়ায় ম্যাচ আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। তবে শেষ পর্যন্ত আক্রমণের ধার বজায় রেখেই কাক্সিক্ষত গোল তুলে নেয় স্পেন।
ফাইনালে নিজের সেরা ছন্দে দেখা যায়নি লিওনেল মেসিকে। তার পরিচিত ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস কিংবা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষমতা- কোনোটিই সেভাবে চোখে পড়েনি। লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলগত পরিকল্পনার সামনে কার্যত নিষ্প্রভ ছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখলে দশজনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ে সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্পেন আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করে।
মেটলাইফ স্টেডিয়াম মেসির জন্য নতুন কোনো সুখস্মৃতি লিখতে পারলো না। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে এই মাঠেই টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করে শিরোপা হারিয়েছিলেন তিনি এবং আবেগের বশে আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। এক দশক পর একই মাঠে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে ফিরলেও শেষ পর্যন্ত আবারও চোখে জল নিয়েই মাঠ ছাড়তে হলো তাকে।
১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে ডিয়েগো ম্যারাডোনার টানা দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের স্বপ্ন ভেঙেছিল, তেমনি ২০২৬ সালের ফাইনালে মেসির পরিণতিও একই হয়। ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের পর আরও একবার ইতিহাস গড়ার সুযোগ ছিল তার সামনে। কিন্তু শেষ ধাপে এসে থেমে গেল আর্জেন্টিনার স্বপ্ন।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি ম্যাচে একাধিক কৌশলগত পরিবর্তন আনলেও স্পেনের সংগঠিত ফুটবলের সামনে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। স্কালোনির গুরু লুইস দে লা ফুয়েন্তে শিষ্যকে কৌশলের লড়াইয়ে স্পষ্টভাবে হারিয়ে দেন। লামিনে ইয়ামাল, মিকেল ওয়ারজাবাল, নিকো উইলিয়ামস ও ফেরান তোরেসদের গতিময় আক্রমণে বারবার চাপে পড়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণ।
পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই স্পেন ছিল সবচেয়ে ধারাবাহিক দল। বলের দখল, দ্রুত পাসিং, আক্রমণের বৈচিত্র্য, শৃঙ্খলিত রক্ষণ এবং চাপের মুহূর্তে মানসিক দৃঢ়তা- সব মিলিয়ে শুরু থেকেই তারা ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার। ফাইনালেও সেই আধিপত্যেরই প্রতিফলন দেখা গেছে।
কাতার থেকে নিউইয়র্ক- চার বছরের এই যাত্রায় মেসি অর্জন করেছেন অসংখ্য গৌরব ও ভালোবাসা। তবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের বিরল কীর্তি আর স্পর্শ করা হলো না তার। অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের স্পেন শুধু বিশ্বকাপ জয়ই করেনি, নিজেদের টিকিটাকাভিত্তিক আধুনিক ফুটবল দর্শনেরও উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে বিশ্বমঞ্চে নতুন এক মহাকাব্য রচনা করেছে।