সুবর্ণভূমি ডেস্ক
মেসি থামলেন। হিসেবের বাইরের এক ফুটবলার ফেরান তোরেস তার গতি রোধ করলেন। এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু। মেসির অপ্রতিরোধ্য গতি থেমে গেল। একইসঙ্গে ভেঙে গেল মেসির নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন। চোখের জলে বিদায় নিলেন। এমনই হয়।
তবে মেসির বিদায় উজ্জ্বল ও রোমাঞ্চকর হবে- তেমনটাই ভেবেছিল ফুটবলবিশ্ব। কিন্তু না পেলেন বিশ্বকাপ ট্রফি। না পেলেন গোল্ডেন বুটের সম্মান। লামিন ইয়ামালের বাহিনী তার হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। ওদিকে ফরাসি তারকা এমবাপ্পে গোল্ডেন বুট ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন। মেসি ফিরলেন শূন্য হাতে। তবে রেখে গেলেন আধুনিক ফুটবলের ছোঁয়া। যা ইতিহাস হয়ে থাকবে।
’৮৬ বিশ্বকাপ জিতে ম্যারাডোনা ইতিহাসের নায়ক হয়েছিলেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির হাতে ট্রফিটা বেশ মানিয়েছিল। এবারও তিনি ছিলেন হট ফেভারিট। ধারণা করা গিয়েছিল, মেসির হাতেই হয়তো আবারও ফুটবলের সর্বোচ্চ উপহারটা যাবে। কিন্তু ইয়ামাল বাহিনী তার সব পরিকল্পনা বানচাল করে দেন। বরং ১০০ মিনিট পর্যন্ত মেসি ছিলেন নিষ্প্রভ। তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। মেসি সম্ভবত আগেই বুঝতে পেরেছিলেন- ফলাফল এমনই হবে। কারণ গোটা আর্জেন্টিনা টিম স্পেনের আক্রমণ শুধু প্রতিহত করেছে। পাল্টা আক্রমণ শানাতে পারেনি। বিরতিহীন আক্রমণের মুখে আর্জেন্টাইন গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ হার মানতে বাধ্য হন। ১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের হেড থেকে আসা বলে দুর্দান্ত গোল করে শেষ পেরেকটা মেরে দেন বদলি নামা ফেরান তোরেস। মেসি দূর থেকে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছিলেন। তার চোখে তখন জল।
তিনি জানতেন, খেলায় ফিরে আসা কঠিন। এর আগে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। স্পেনের মতো টিমের সঙ্গে দশজন নিয়ে জেতা বা খেলা খুবই কঠিন। স্পেন এবার সুসংগঠিত অনবদ্য এক টিম। যদিও এই আসরের শুরুটা ভালো ছিল না স্পেনের। ড্র করেছিল কেপ ভার্দের সঙ্গে।
পরপর দু’বার বিশ্বকাপ নিয়ে মেসি নতুন ইতিহাস তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কপাল এমনই আট গোল করেও গোল্ডেন বুট পেলেন না। এমবাপ্পে ১০ গোল করে তার স্বপ্ন ভেঙে দেন। এখন মেসির কান্না ক্যামেরাবন্দী করছেন হাজার হাজার ফটো সাংবাদিক। টেলিভিশনের পর্দায় তা দেখা গেছে। মেসি শুধু কাঁদছেন।
আর ইয়ামাল কীভাবে ট্রফিতে একের পর এক চুমু খাচ্ছেন তা দেখছেন। চুমু খাওয়ারই কথা। এই খেলার আগে অনেকেই বলেছিলেন, এটা গুরু-শিষ্যের লড়াই। তবে মেসি কিন্তু খুব সতর্ক মন্তব্য করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘স্পেন খুব ভালো একটা দল। বেশ কয়েকজন অসাধারণ ফুটবলার রয়েছেন দলটিতে। এদের ফুটবলদর্শন বহুবার দেখেছি। আমি জানি, ওরা কেমন খেলবে।’
মেসি বার্সেলোনা ছাড়ার সময় কেঁদেছিলেন। চোখের পানিতে তার বুক ভেসেছিল। আবেগআপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন, গুডবাই বার্সেলোনা। বার্সেলোনার অনেক সতীর্থ স্পেন টিমে। তিনি হয়তো মনে মনে ভেবেছিলেন, এর প্রতিশোধ নেবেন। সেটা কী আর হয়! আটলান্টিকে অনেক পানি গড়িয়েছে। মেসির বয়স হয়েছে। তারও বিদায় নেওয়ার সময়। এমনই একটা পরিস্থিতি তৈরি হলো- বাড়ির কাছে বিশ্বকাপ, সেটা তিনি জয় করতে পারলেন না।
তবে আর্জেন্টিনাকে অনেক দিয়েছেন তিনি। ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকবে।
যে যাই বলুন না কেন, খেলাটা ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। স্পেন যেভাবে আক্রমণ করেছে তাতে কয়েক গোলেই জেতার কথা। গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ যেভাবে বল প্রতিহত করেছেন তা রীতিমতো বিস্ময়কর। মেটলাইফের ৮০ হাজার ৬৬৩ জন দর্শক শ্বাসরুদ্ধকর এই খেলাটির ভাগ্য কী দাঁড়ায়- তা দেখার জন্য ছটফট করছিলেন।
বিশ্বকাপে এবারও কোনো চমক হলো না। স্পেন দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হলো। বিশ্বকাপের আসর বসেছে ২৩ বার। এর মধ্যে জয়ী হয়েছে ইউরোপের ছয়টি দেশ। আর লাতিন আমেরিকার তিনটি। এশিয়া-আফ্রিকা থেকে একবারও চ্যাম্পিয়ন হয়নি কোনো দল।
উল্লেখ্য যে , ব্রাজিল পাঁচ বার, জার্মানি চার বার, ইতালি চার বার, আর্জেন্টিনা তিন বার, ফ্রান্স দুই বার, উরুগুয়ে দুই বার আর স্পেন দুই বার। ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছে একবার।
এবার তিন দেশে ৪৮ দলের খেলা। এটাই একটা বাড়তি চমক। তবে নতুন কিছু প্লেয়ারের উত্থান ঘটেছে এই বিশ্বকাপে।
[লেখা: মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী]