যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

এক বছরে সুবর্ণভূমির যত আলোচিত প্রতিবেদন

রায়হান সিদ্দিক

, যশোর

প্রকাশ : শনিবার, ১০ অক্টোবর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
এক বছরে সুবর্ণভূমির যত আলোচিত প্রতিবেদন

প্রথম বর্ষ পেরিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করেছে বিকাশমান মিডিয়া আউটলেট সুবর্ণভূমি। এক বছরের পথচলায় দৈনন্দিন সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি অন্তরালে থাকা বহু ঘটনা তুলে এনেছে পাঠকের সামনে। সাড়া জাগানো সেসব সংবাদের বিষয়বস্তু অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, জনদুর্ভোগ, পরিবেশগত বিপর্যয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি, কৃষকের সংকট, ভোক্তা হয়রানি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, অপরাধ এবং সম্ভাবনার গল্প। কখনও ইতিহাস থেকে তুলে আনা হয়েছে বিস্মৃতপ্রায় কোনো কাহিনি।

এই এক বছরে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সুবর্ণভূমির অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সাধারণ মানুষ। কখনো স্কুলপড়ুয়া শিশুর অবসাদগ্রস্ত শৈশব, কখনো কৃষকের ফসল হারানোর বেদনা, কখনো রোগীর চিকিৎসা না পাওয়ার অসহায়ত্ব, কখনো নগরবাসীর জলাবদ্ধতা, মশা, যানজট ও বর্জ্য সংকট, আবার কখনও প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ব্যক্তিবিশেষের এগিয়ে যাওয়ার গল্প বা সামগ্রিক উন্নয়নের চিত্র। সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে পেছনের কারণ খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছে সুবর্ণভূমি। সম্ভাব্য সমাধানও বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান রাখেন, এমন ব্যক্তিদের মুখ থেকে বলানোর চেষ্টা করেছে। আর এসব কিছুই করা হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমের জনপদে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে।

বিগত এক বছরে সুবর্ণভূমি যেসব জনগুরুত্বপূর্ণ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার সংখ্যা শতাধিক। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:

অবসাদগ্রস্ত শৈশব, বিপন্ন ভবিষ্যৎ

প্রথম বর্ষের শেষ দিকে এসে ‘অবসাদগ্রস্ত শৈশব, বিপন্ন ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করে সুবর্ণভূমি। এখনও আলোচনায় থাকা এই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, প্রাথমিকের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্কুল, কোচিং, হোমওয়ার্ক ও অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপে স্বাভাবিক শৈশব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

একজন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন রুটিন তুলে ধরে প্রতিবেদনটি দেখিয়েছে, পড়াশোনার চাপের কারণে শিশুর বিশ্রাম, খেলাধুলা, পুষ্টিকর খাবার ও পারিবারিক সময় কমে যাচ্ছে। শিক্ষকরাও জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ক্লাস ও কোচিংয়ের কারণে শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং মনোযোগ হারায়।

এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে বড় দিক ছিল, এটি শুধু ‘শিক্ষার চাপ’ নিয়ে কথা বলেনি; বরং প্রশ্ন তুলেছে, শিক্ষার নামে আমরা কি শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশের পথ সংকুচিত করে দিচ্ছি? শিশুদের নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্বেগকে সমর্থন করে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও স্থান পেয়েছে প্রতিবেদনটিতে।

ইসকনে ক্ষুব্ধ খোদ সনাতনিরা

যশোরের ঐতিহ্যবাহী চাঁচড়া দশমহাবিদ্যা মন্দিরে ইসকনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং তাদের বিতর্কিত তৎপরতা নিয়ে গেল মাসে সুবর্ণভূমি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করে ‘ইসকনে ক্ষুব্ধ খোদ সনাতনিরা’ শিরোনামে। মন্দির চত্বরে বসবাসকারী এক কিশোরীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর উঠে আসা নানা সামাজিক ও অনৈতিকতার অভিযোগ তুলে ধরা হয় এতে।

প্রতিবেদনে মৃত কিশোরীর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ইসকন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, সাধারণ বাসিন্দাদের উচ্ছেদ প্রচেষ্টা এবং মন্দির গ্রাসের নানাবিধ তথ্য উঠে আসে। সুবর্ণভূমির অনুসন্ধানের মূল দিকটি ছিল স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও এলাকাবাসীর বক্তব্য সামনে আনা, যেখানে সাধারণ মানুষ মন্দির প্রাঙ্গণে অসদাচরণ ও সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সংবাদটি প্রকাশের পর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এরপর সুবর্ণভূমি এই সংক্রান্ত বিষয়ে আরও কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করে; যা নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে।

বাজারে ভারতীয় ইলিশ, চালানো হচ্ছে মিয়ানমারের নামে

উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘বাজারে ভারতীয় ইলিশ, চালানো হচ্ছে মিয়ানমারের নামে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় সুবর্ণভূমিতে। বেনাপোল স্থলবন্দরের কাগজপত্রে ‘ভারতীয় ইলিশ’ বলা হলেও যশোরের বাজারে সেই মাছের একটি অংশ ‘মিয়ানমারের ইলিশ’ নামে বিক্রি করা হচ্ছে— এমন অসঙ্গতি সামনে আনে সুবর্ণভূমির আলোচ্য প্রতিবেদনটি।

প্রতিবেদনটি ভোক্তার সচেতনতা তৈরি এবং বাজারে পণ্যের উৎস ও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর বাজারে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং ঝটিকা অভিযান শুরু হয়। ইলিশের বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আগেই প্রশাসন কঠোরভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে।

স্বপ্ন থেকে দুর্গন্ধময় বাস্তবতা

প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে যশোরে গড়ে ওঠা সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পকে ঘিরে করা প্রতিবেদন ‘স্বপ্ন থেকে দুর্গন্ধময় বাস্তবতা’ দেখিয়েছে উন্নয়নের একটি বড় প্রকল্প কীভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল না দিয়ে স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বর্জ্য থেকে জৈব সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রকল্পটি আট বছর পর কার্যত অচলাবস্থা, দুর্গন্ধ, দূষিত পানি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্থানীয় সরকার পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ এবং বিশেষজ্ঞ টিম ও উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের তথ্য মেলে।

যেসব কারণে যশোর শহরে যানজট

যানজটকে কেবল ট্রাফিক পুলিশের দুর্বলতা হিসেবে না দেখে এর পেছনে থাকা বহুমাত্রিক কারণ খুঁজেছে সুবর্ণভূমি ‘যেসব কারণে যশোর শহরে যানজট’ শিরোনামে চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে।

কেউ খাবার পায়, কেউ পায় না

যশোর জেনারেল হাসপাতালে রোগীদের খাবার বিতরণে অব্যবস্থাপনা নিয়ে করা প্রতিবেদন ‘কেউ খাবার পায়, কেউ পায় না’ সরকারি স্বাস্থ্যসেবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা তুলে ধরে। প্রতিবেদনটিতে রোগীদের জন্য নির্ধারিত খাবার, বিতরণ ব্যবস্থা ও মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বরাদ্দ বাড়লেও রোগী ও স্বজনদের সন্তুষ্টি পুরোপুরি ফেরেন—এমন তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে আসে।

হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর পুষ্টি নিশ্চিত করাও চিকিৎসা ব্যবস্থার অংশ। তাই খাবার নিয়ে এই অনুসন্ধান হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে আনে।

লবণাক্ততায় বদলে যাচ্ছে উপকূলীয় জীবন

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের জীবনে লবণাক্ততার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে ‘লবণাক্ততায় বদলে যাচ্ছে উপকূলীয় জীবন’ প্রতিবেদনটি শুধু পরিবেশের সংকট নয়, মানুষের জীবিকা ও সামাজিক পরিবর্তনের কথাও বলেছে।

সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবিকা সংকুচিত হওয়া, বিকল্প আয়ের অভাব, ঋণ ও দাদন ব্যবস্থার চাপ—সব মিলিয়ে উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তনের চিত্র এতে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি মনে করিয়ে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল নদী বা মাটির সমস্যা নয়; এটি মানুষের আয়, খাদ্য, পেশা ও ভবিষ্যতের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

পরিচ্ছন্নতায় কোটি টাকা খরচ, তবু দুর্গন্ধময় যশোর

যশোর শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সুবর্ণভূমির ধারাবাহিক অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘পরিচ্ছন্নতায় কোটি টাকা খরচ, তবু দুর্গন্ধময় যশোর’।

শহরের বিভিন্ন স্থানে ময়লার স্তূপ, ড্রেনের ওপর পচা বর্জ্য, অনানুষ্ঠানিক ডাম্পিং স্পট এবং দুর্গন্ধের পাশাপাশি প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়, পৌরসভার বিপুল সংখ্যক পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও যানবাহন থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থাপনা কেন হচ্ছে না?

শুধু ৬০৩ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দৈনিক মজুরি বাবদই বিপুল অর্থ ব্যয়ের তথ্য প্রতিবেদনে উঠে আসে। একইসঙ্গে ঝুমঝুমপুরের বর্জ্য শোধনাগারের সক্ষমতার তুলনায় খুব কম বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত হওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে। ফলে প্রশ্ন আসে, পেছনে আসলে অর্থের অভাব, নাকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা?

যশোর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসকের দেখা মেলা ভার!

‘যশোর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসকের দেখা মেলা ভার!’ প্রতিবেদনটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিতি, রোগীর তথ্য সংরক্ষণ ও ওষুধ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সামনে আনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক দফা সরেজমিনে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি এবং চিকিৎসক না থাকায় দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে; কেউ কেউ চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ায়। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সমাধানের জন্য কার্যকরী উদ্যোগ নিতেও দেখা গেছে। হাসপাতালটি বর্তমানে চিকিৎসার মান উন্নয়নে গত ১৮ সেপ্টেম্বর সিজারিয়ান সেকশন সেবা কার্যক্রম উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সেখানে দ্রুতই শয্যাসংখ্যাও বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে।

নেশার ভয়াল গ্রাস

একটি পরিবারের করুণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মাদকাসক্তির ভয়াবহতা তুলে ধরে ‘নেশার ভয়াল গ্রাস’ শিরোনামে প্রকাশিত ও প্রচারিত প্রতিবেদন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এক কিশোরের মাদকে জড়িয়ে পড়া এবং ধীরে ধীরে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন ভেঙে পড়ার গল্প প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এটি ছিল পরিসংখ্যানের চেয়ে মানুষের জীবনের বাস্তব ক্ষতি দেখানোর একটি মানবিক অনুসন্ধান। প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে আক্রান্ত করে না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো পরিবারে।

যশোর হাসপাতালে ডেঙ্গু ছড়ানোর ফাঁদ!

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মশারির মধ্যে রাখার স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগ নিয়ে ‘যশোর হাসপাতালে ডেঙ্গু ছড়ানোর ফাঁদ!’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।

প্রতিবেদনটি প্রশ্ন তোলে, যে হাসপাতালে মানুষ সুস্থ হতে যায়, সেখানেই যদি মশার মাধ্যমে সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়, তবে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর? প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও পরবর্তীতে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা কাগজ-কলমেই

গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের জন্য সরকারি বিনামূল্যের অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা অনুসন্ধান করে সুবর্ণভূমি। ‘ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা কাগজ-কলমেই’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে রেকর্ডে মাত্র একজনের এই সেবা গ্রহণের তথ্য পাওয়া যায়। এতে প্রশ্ন ওঠে, সরকারি মহান উদ্যোগটি জনগণের কাছে আসলেই কি পৌঁছেছে?

পরিকল্পনাহীনতায় ডুবছে শহর যশোর

যশোর শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি কারণ খুঁজে ‘পরিকল্পনাহীনতায় ডুবছে শহর যশোর’ প্রতিবেদনটি দেখিয়েছে, ভারী বৃষ্টিতে শুধু রাস্তা নয়, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও পানিতে তলিয়ে যায়।

শহরের কয়েকটি ওয়ার্ডের লাখো মানুষের বর্ষাকালীন দুর্ভোগ, পানি ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং ভৈরব নদকে টেকসই বিকল্প হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা প্রতিবেদনে উঠে আসে। এই প্রতিবেদনে বৃষ্টির পানি ভৈরবমুখী করার মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেওয়ার তাগাদা দিয়েছে। কারণ শহরের দক্ষিণাংশের পানি যে বিলহরিণায় যেত, সেই বিলের তলদেশই এখন দখলসহ নানা কারণে শহরের ভূমিসমতল থেকে উঁচু হয়ে গেছে।

গাছগুলো যায় কোথায়

বছরের পর বছর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও রোপণ করা গাছের কতটি বেঁচে থাকে?—সুবর্ণভূমি এই প্রশ্ন তুলে ‘গাছগুলো যায় কোথায়’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃক্ষরোপণের পর রক্ষণাবেক্ষণ ও টিকে থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। ফলে শুধু চারা রোপণ নয়, গাছের পরিচর্যা ও বেঁচে থাকার হারও পরিবেশ কর্মসূচির সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত। প্রতিবেদনটি সরকারি ও বেসরকারি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে ‘সংখ্যা’ নয়, ‘ফলাফল’কে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জোরালো করে।

পুষ্টি ঘাটতিতে উপকূলের মানুষ

উপকূলীয় জনপদে খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি সংকট নিয়ে ‘পুষ্টি ঘাটতিতে উপকূলের মানুষ’ প্রতিবেদনটি দেখায়, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কীভাবে মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘদিন মাংস না খাওয়ার কারণে রক্তস্বল্পতা ও পুষ্টিজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি এতে উঠে আসে। প্রতিবেদনটি উপকূলীয় উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামো বা বাঁধ নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গেও যুক্ত করেছে।

পত্রিকার কাগজে গরম খাবার, শরীরে ঢুকছে বিষাক্ত কেমিক্যাল

রাস্তার পাশের দোকান ও হোটেলে পুরনো সংবাদপত্রে গরম খাবার পরিবেশনের প্রচলন নিয়ে ‘পত্রিকার কাগজে গরম খাবার, শরীরে ঢুকছে বিষাক্ত কেমিক্যাল’ প্রতিবেদনটি ভোক্তা স্বাস্থ্যঝুঁকি সামনে আনে। গরম খাবারের সঙ্গে সংবাদপত্রের কালি ও রাসায়নিক পদার্থ শরীরে প্রবেশের আশঙ্কা তুলে ধরে প্রতিবেদনটি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের খাবার গ্রহণের একটি অভ্যাসকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

স্কুলের দেয়ালঘেঁষে তামাকপাতা প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র, ঝুঁকিতে শিশুরা

বিদ্যালয়ের পাশে তামাকপাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেদনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে আনে। একদিকে শিশুদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ, অন্যদিকে তামাকজাত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ; এই দ্বন্দ্বটি প্রতিবেদনের মূল বিষয়। প্রতিবেদনটি শিশুদের স্বাস্থ্য ও বিদ্যালয়ের চারপাশের পরিবেশগত নিরাপত্তাকে নতুন করে আলোচনায় আনে।

যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ: ‘পাগলা মৌলভি’ কেন বিস্মৃতির অতলে!

প্রথম বর্ষের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অনুসন্ধানগুলোর একটি ছিল ‘যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ: ‘পাগলা মৌলভি’ কেন বিস্মৃতির অতলে!’। সরকারি দপ্তরেও যার প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস নেই, সেই কেন্দ্রীয় ঈদগাহের পেছনে থাকা মমতাজ উদ্দীন ওরফে ‘পাগলা মৌলভি’র ভূমিকা খুঁজে বের করে সুবর্ণভূমি।

প্রবীণ মানুষ, পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের মাধ্যমে উঠে আসে, পরিত্যক্ত জমিকে ঈদগাহে রূপান্তরের জন্য এক নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তির দীর্ঘদিনের চেষ্টার সফলতা। এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো যশোরের একটি পরিচিত স্থাপনার বিস্মৃত ইতিহাসকে নতুন করে মানুষের সামনে ফিরিয়ে আনা।

গাভী ছাড়াই ‘দুধ’, বিক্রি হচ্ছে নামী চেইনশপে

দুধের নামে বাজারজাত পণ্যের প্রকৃত উপাদান ও মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে ‘গাভী ছাড়াই ‘দুধ’, বিক্রি হচ্ছে নামী চেইনশপে’ প্রতিবেদনটি খাদ্যপণ্যের গুণমান ও ভোক্তা প্রতারণার বিষয় সামনে আনে। বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের আউটলেটে দুধের নামে যা বিক্রি হচ্ছে, তাতে হয় দুধের লেশমাত্র নেই অথবা থাকলেও সামানই—এই ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে প্রতিবেদনটিতে। এতে বলা হয়, সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রায়ই এই ধরনের প্রতারণার বিরুদ্ধে মাঠ পর্যায়ে অভিযান চালালেও চকচকে বিক্রয় কেন্দ্র পর্যন্ত তাদের হাত পৌঁছায় না।

অগ্নিকাণ্ড: শহর যশোরে শতাধিক বহুতল ভবন ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’

জাবির হোটেল ইন্টারন্যাশনালে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৪ জন নিহত হওয়ার স্মৃতি সামনে রেখে যশোর শহরের অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে সুবর্ণভূমির অনুসন্ধান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শহরে এখনও শতাধিক বহুতল ভবন অগ্নিকাণ্ডের দিক থেকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। কয়েকটি ভবনে সরেজমিনে গিয়ে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতির সত্যতাও মিলেছে। এই প্রতিবেদনটি একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে, আগের ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে আমরা কতটা শিক্ষা নিয়েছি? অগ্নিনিরাপত্তা, ফায়ার এক্সিট, সরু রাস্তা, পানির সংকট এবং অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ—সব মিলিয়ে যশোরের নগর নিরাপত্তার বড় দুর্বলতা এতে সামনে এসেছে।

ফ্যাসিবাদী জমানার বাহিনীগুলোর নিয়ন্ত্রণে যশোরের অপরাধজগৎ

যশোরের অপরাধজগতের পেছনে সক্রিয় সন্ত্রাসী বাহিনী ও তাদের নেটওয়ার্ক নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি ছিল প্রথম বর্ষে অপরাধভিত্তিক অন্যতম গভীর কাজ। প্রতিবেদনে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে অন্তত দশটি সন্ত্রাসী বাহিনীর কথা উঠে আসে এবং শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাদের প্রভাবের কথা বলা হয়। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও চাঁদাবাজি, খুন, মাদক, অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে ফ্যাসিবাদের অনুগ্রহপুষ্ট বাহিনীগুলোর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে ধরে প্রতিবেদনটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অন্তর্নিহিত কাঠামো নিয়ে আলোচনার খোরাক তৈরি করে।

‘কর্পোরেট দাস’ মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ

ওষুধ কোম্পানির মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জীবন ও শ্রমের বাস্তবতা নিয়ে ‘‘কর্পোরেট দাস’ মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ” প্রতিবেদনটি ছিল পেশাজীবীদের একটি প্রায় অদৃশ্য সংকটের অনুসন্ধান। উচ্চশিক্ষিত হয়েও দীর্ঘ সময় কাজ, টার্গেটের চাপ, ছুটির সীমাবদ্ধতা এবং চাকরি হারানোর ভয়—সবকিছু মিলিয়ে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের কর্মজীবনের চাপ এতে উঠে আসে। ওষুধ বিপণনের সঙ্গে যুক্ত এই কর্মীরা নিজেদের এই আধুনিক সভ্যতায়ও ‘দাস’ হয়ে থাকার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে কর্পোরেট দুনিয়ার এক অন্ধকার জগতের কথা তুলে ধরেন।

অনলাইন জুয়ায় সর্বনাশ

অনলাইন জুয়ার ভয়াবহ সামাজিক প্রভাব নিয়ে ‘অনলাইন জুয়ায় সর্বনাশ’ প্রতিবেদনটি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একজন তরুণের সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহত্যা, আরেক শিক্ষার্থীর মোবাইল আসক্তি ও আত্মহত্যা এবং একজন ব্যবসায়ীর প্রায় ১৮ লাখ টাকা ঋণে জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনা প্রতিবেদনে উঠে আসে। এটি দেখায়, অনলাইন জুয়া শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় নয়; এটি পরিবার, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষাজীবন এবং কখনো কখনো মানুষের জীবন পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারে।

ফসলের ক্ষেতে বিষের বিজ্ঞাপন

কৃষিজমিতে কীটনাশকের বিজ্ঞাপন এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের বিপজ্জনক প্রবণতা নিয়ে ‘ফসলের ক্ষেতে বিষের বিজ্ঞাপন’ প্রতিবেদনটি কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি সদ্য কীটনাশক প্রয়োগ করা ফল ও সবজি বাজারে আসার ঝুঁকিও রয়েছে। রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটি, পানি, উপকারী পোকামাকড় ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রতিবেদনটি নিরাপদ কৃষি ও জৈব বালাইনাশকের প্রয়োজনীয়তার দিকে দৃষ্টি ফেরায়।

ভৈরবের পানিতে বিষ

যশোরের ভৈরব নদের পানি দূষণের ভয়াবহতা নিয়ে ‘ভৈরবের পানিতে বিষ’ প্রতিবেদনটি পরিবেশগত সংকটের গভীরতা সামনে আনে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষায় নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে কম পাওয়ার তথ্য এতে উঠে আসে। বিশেষজ্ঞরা নদীর পানি জলজ প্রাণী ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করেছেন। একটি নদীর দূষণ শুধু নদীকে মারে না; এর সঙ্গে মাছ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও নদীপাড়ের মানুষের জীবনও সংকটে পড়ে। প্রতিবেদনটি সেই সামগ্রিক বিপদের চিত্র তুলে ধরে।

মৃতরাও ‘ভোট দিয়েছিলেন’ যে কেন্দ্রে

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে যশোরের একটি কেন্দ্রে অস্বাভাবিকভাবে ১০০ শতাংশ ভোট পড়ার ঘটনাকে ঘিরে করা অনুসন্ধান ‘‘মৃতরাও ‘ভোট দিয়েছিলেন’ যে কেন্দ্রে’’ ছিল প্রথম বর্ষের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক অনুসন্ধানগুলোর একটি। সরেজমিনে গিয়ে প্রতিবেদনে এমন ভোটারের তথ্য তুলে ধরা হয়, যারা নির্বাচনের আগে মারা গিয়েছিলেন, বিদেশে ছিলেন বা শয্যাশায়ী ছিলেন। ভোটের আগের রাতের কর্মকাণ্ড, ব্যালট বাক্সে ব্যালট ঢোকানোর অভিযোগ এবং ভোটের দিন সহিংস পরিবেশের কথাও এতে উঠে আসে। প্রতিবেদনটি নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে।

সুবর্ণভূমির প্রথম বছরের বিশেষ প্রতিবেদনগুলো একটি বিষয় অন্তত পরিষ্কার করেছে, খবর শুধু ঘটনার বিবরণ নয়; খবর মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। আর সেই মানুষের কথা বলার দায়িত্বই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় দায়। প্রথম বর্ষ পেরিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে তাই সুবর্ণভূমির যাত্রা শুধু একটি সংবাদমাধ্যমের বর্ষপূর্তি নয়; বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কথা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার নতুন অঙ্গীকারেরও সময়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)