আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস আজ
সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী
, যশোর
‘চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করেন। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পুরো যাত্রায় যিনি পরম মমতায় পাশে থাকেন তিনি একজন নার্স’-এই সত্যকে ধারন করেই ১২ মে মঙ্গলবার উদযাপিত হবে আন্তর্জাতিক নার্সেস দিবস।
আধুনিক নার্সিংয়ের অগ্রদূত ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বে প্রতি বছর এই দিনটি নার্সেস দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। ১২ এপ্রিল মঙ্গলবার নাইটিঙ্গেলের ২০৬তম জন্মবার্ষিকী। এবারের নার্সেস দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে ‘আমাদের নার্স। আমাদের ভবিষ্যৎ। ক্ষমতায়িত নার্সরাই জীবন বাঁচায়।’
১৮২০ সালের ১২ মে জন্মেছিলেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে আহত সৈন্যদের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি হয়ে ওঠেন ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’। তাঁরই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আজও যশোরসহ সারা বিশ্বের হাসপাতালগুলোতে প্রদীপ জ্বলছে মানবতার সেবায়।
এক সময় নার্সিং পেশাকে কেবল সাধারণ ‘সেবা’ হিসেবে দেখা হলেও ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই পেশা এখন একটি উচ্চমর্যাদার ‘টেকনিক্যাল ক্যারিয়ার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে যশোরের নার্সিং সেক্টরেও লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া।
যশোরের বুক চিরে বয়ে চলা ভৈরব নদ যেমন এ জনপদকে জীবন দেয়, তেমনি শহরের সরকারি, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচাতে দিনরাত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন কয়েক হাজার সেবিকা।
যশোর সিভিল সার্জন অফিসের পাবলিক হেলথ নার্স অফিসের পরিসংখ্যানে জানা গেছে, যশোরে প্রায় ১৮ হাজারের বেশি রেজিস্ট্রার্ড নার্স রয়েছেন। এর মধ্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ২৯০জন, সাত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মিলে মোট দুই হাজার পাঁচশ’জন নার্স কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সিএইচএমএস-এ কর্মরত রয়েছেন অন্যরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশে নার্সের সংখ্যায় এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য নার্স আছেন মাত্র চারজনের মতো, যেখানে প্রয়োজন অন্তত দশ থেকে ২৩ জন। চিকিৎসকের তুলনায় তিনজন নার্স থাকার কথা থাকলেও, দেশে এখনো একজন চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স একজনেরও কম রয়েছেন।
যশোরের স্বাস্থ্য সেবার ইতিহাসে নার্সদের অবদান অপরিসীম। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি যশোর নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজ দশকের পর দশক ধরে তৈরি করছে দক্ষ ও মানবিক নার্স। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে হালের করোনা মহামারি, যশোরের নার্সরা বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন মানুষের জীবন বাঁচাতে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার তুতুল আক্তার বলেন, বর্তমান বাংলাদেশে নার্সিং সংকটের ভিড়ে আশার আলোও কম নয়। সরকার নার্সিং শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করতে নিয়েছে বড় প্রকল্প। বিশেষ করে দক্ষ নার্স ও শিক্ষক তৈরিতে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড নার্সিং এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এনআইএএনইআর) এ পিএইচডি বা ডক্টরাল প্রোগ্রাম চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, যশোরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্সিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি, যশোর নার্সিং কলেজসহ দেশের সকল সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে গড়ে তোলা হচ্ছে আধুনিক সিমুলেশন ল্যাব। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও বাড়ছে বাংলাদেশি নার্সদের কদর। কোরিয়া, সৌদি আরব, কাতার ও কানাডার মতো দেশের নার্সদের বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে এখন ইউরোপ ও আমেরিকাতেও বাংলাদেশি নার্সদের জন্য তৈরি হচ্ছে কর্মের সোনালী সুযোগ।
২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে হাজার হাজার নতুন ‘সিনিয়র স্টাফ নার্স’ পদ তৈরি করা হয়েছে। নার্সরা এখন সরকারি চাকরিতে দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা পাচ্ছেন, যা মেধাবী তরুণ, তরুণীদের এই পেশায় আসার আগ্রহ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারি সুযোগ, সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন তারা।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্সিং বিভাগের প্রভাষক অঞ্জন কুমার রায় বলেন, যশোরের নার্সরা কেবল সেবার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে এখন উচ্চশিক্ষা, পিএইচডি প্রোগ্রাম এবং নিজেদের পেশাগত অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও অনেক বেশি সোচ্চার রয়েছেন।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্সিং বিভাগের (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ শামীন আক্তার সুমি বলেন, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি ব্যাচে মোট ২০জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। এদের মধ্যে সাতজন বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এই শিক্ষাথীকে হাতে কলমে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদান করা হয়। এছাড়া যে সকল শিক্ষার্থী পাশ করে বের হয়েছেন, তারা বিদেশে দক্ষতার সাথে কাজ করছেন। আগামীতে মাস্টার্সের সাথে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করা হবে।
এদিকে, দিবসটি উপলক্ষে যশোর মেডিকেল নার্সিং কলেজসহ শহরের বিভিন্ন নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউট বর্ণাঢ্য র্যালি, কেক কাটা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
যশোর নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের নেতা ও যশোর মেডিকেল নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ আর্জিনা খাতুন বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষা ও উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নার্সরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ। তবে এই অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করতে প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন ও কর্মক্ষেত্রে নার্সদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সেবিকাদের চ্যালেঞ্জ আছে, আছে সামাজিক কিছু বাধা। কিন্তু শত বাধা পেরিয়ে নার্সরা আজ শুধু সেবিকা নন, তারা একেকজন দক্ষ স্বাস্থ্যযোদ্ধা। তাদের হাত ধরেই বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের আগামীর স্বাস্থ্যসেবা।