যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

চৌগাছায় মডেল মসজিদ নির্মাণ নিয়ে প্রশাসন-ব্যবসায়ী মুখোমুখি

রাব্বি আল-আমিন

, যশোর

প্রকাশ : বুধবার, ৩ জুন,২০২৬, ১২:০০ পিএম
চৌগাছায় মডেল মসজিদ নির্মাণ নিয়ে প্রশাসন-ব্যবসায়ী মুখোমুখি

যশোরের চৌগাছায় সরকারি মডেল মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত তিন দশকের পুরনো পাইকারি সবজি বাজারের একাংশ জুড়ে এই মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, হাটের জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করা হলে শত শত আড়ত ধ্বংস হবে এবং অন্তত আড়াই হাজার পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। অন্যদিকে, প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে সরকারি জায়গার ওপরই মসজিদ নির্মিত হবে এবং খুব শিগগিরই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে কাজ শুরু করা হবে।

সরকার সারাদেশে মডেল মসজিদ নির্মাণের যে উদ্যোগ নেয়, তারই অংশ হিসেবে চৌগাছা উপজেলায় প্রধান পাইকারি সবজি বাজারে একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত বছরের ১১ জুলাই তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব এবং বর্তমান সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দীর্ঘ ১১ মাস পার হলেও জমি হস্তান্তর সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখনো দৃশ্যমান কোনো কাজ শুরু করতে পারেনি।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের অংশ হিসেবে চৌগাছায় একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করা হয়। যার ডিপিপি মূল্য ধরা হয় ১৪ কোটি ৯৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। এরপর ১৩ কোটি ৯৭ লাখ ৫৩ হাজার টাকায় কাজটি সম্পন্ন করার জন্য ২০২৪ সালের ১৪ জানুয়ারি যশোর উপশহরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসআই একেজে পিসি-র সাথে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করার কথা।

কিন্তু বিপত্তি বেধেছে মসজিদের স্থান নির্ধারণ নিয়ে। চৌগাছা শহরের প্রাণকেন্দ্রে সরকারি শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মোট জমি ৩৩ বিঘা। এরমধ্যে প্রায় ১৭ বিঘা জমিজুড়ে তিন দশক ধরে দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ এই পাইকারি সবজি বাজার গড়ে উঠেছে। এই জমিতে (বর্তমান কাঁচাবাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে) মসজিদটি নির্মাণ হবে ৪৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ জায়গার উপর। নির্মাণের জন্য ২৮ হাজার ৬৮৫ বর্গফুট জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, প্রায় তিন দশক ধরে এখানে রমরমা সবজি বাজার। এই সবজি বাজারটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ। এখান থেকে বিভিন্ন ধরনের সবজি সারাদেশে সরবরাহ করা হয়। প্রতি বছর চৌগাছা পৌরসভা থেকে ব্যবসায়ীরা এই হাট ইজারা নেন, যা থেকে সরকার প্রতি বছর কোটি টাকার ওপর রাজস্ব পায়। এছাড়া এর সাথে শত শত ব্যবসায়ীর কর্মসংস্থান ও সংসার জড়িত। এই বাজারের ওপর নির্ভর করে এ অঞ্চলের প্রায় আড়াই হাজার পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু হঠাৎ করে সবজি বাজারের বৃহৎ অংশ দখলে নিয়ে মডেল মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এই স্থানে মসজিদ হলে প্রায় ১৭২টি আড়ৎ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সব মিলিয়ে পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার মানুষের রুটি-রুজি জড়িয়ে আছে এই বাজারের সাথে। একারণে হাট ধ্বংস হবে সরকার হারাবে রাজস্ব বলছেন ব্যবসায়ীরা।

গত ২২ এপ্রিল প্রশাসন নির্ধারিত স্থানে মাটি পরীক্ষার কাজ শুরু করলে স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতিরোধের মুখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জমি হস্তান্তরের জটিলতায় কাজ শুরু করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। মসজিদ নির্মাণের জন্য স্থান নির্ধারণে শুরু থেকেই নানা জটিলতায় পড়ে চৌগাছা উপজেলা প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন। ব্যবসায়ীদের বাধার কারণে দীর্ঘদিনেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মসজিদ নির্মাণের জায়গা হস্তান্তর করতে পারেনি।

ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের দাবি, চৌগাছার পারবাজারে প্রায় দশ বিঘা সরকারি জমি পড়ে আছে। সেখানে মসজিদটি নির্মিত হলে শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারের ব্যবসায়ীদের জীবিকাও রক্ষা পাবে।

চৌগাছা কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিএম আয়নাল হোসেন বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন এখানে পরিত্যক্ত জায়গা দেখিয়ে মডেল মসজিদ নির্মাণ করতে চাচ্ছে। কিন্তু অনেক আগে থেকে এখানে চৌগাছার ঐতিহ্যবাহী কাঁচাবাজারের হাট বসে। এখানে প্রায় ২০০ আড়ৎ আছে। হাট রক্ষা করে মসজিদ হোক আমরা সমর্থন দেবো, কিন্তু হাট ধ্বংস করা হলে মসজিদ হতে দেবো না।’

চৌগাছা আড়ৎদার কাঁচা াজার সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান বলেন, ‘১৯৭৫ সাল থেকে এখানে চৌগাছার কাঁচাবাজার। হাট উঠিয়ে মডেল মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে চৌগাছা উপজেলা প্রশাসনের সাথে বসি। তাদের জানাই সাধারণ মানুষের রুটিরুজি বন্ধ করে মসজিদ নির্মাণ ইসলামের দৃষ্টিতে কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা প্রশাসনের ভেবে দেখা উচিত।’

তিনি জানান, এখানে ব্যবসায়ীরা পাঁচ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছে, যা এখন ঝুঁকির মুখে।

স্থানীয় বাসিন্দা মতিউর রহমান মন্টু বলেন, কারোর পেটে লাথি মেরে মসজিদ নির্মাণ ইসলামসম্মত না। এখান থেকে মসজিদের ভিত্তি সরিয়ে অন্যত্র করার জন্য দাবি জানান তিনি।

স্থান নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা থাকলেও পিছু হটতে নারাজ প্রশাসন ও গণপূর্ত বিভাগ। গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সারাদেশের মতো চৌগাছা উপজেলায় একটি মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাবনা আছে। মাটি পরীক্ষার কাজ শেষ করেছি। যেখানে মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জায়গা। ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এনওসি পেয়েছি। পাশাপাশি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এই নির্মাণ কাজ করার অনুমতি পেয়েছি। আমরা খুব দ্রুত কাজ শুরু করবো।’

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, এই মডেল মসজিদটি যেখানে নির্মাণ হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ সরকারি জায়গা। এখানে দীর্ঘদিন ধরে কাঁচাবাজার বসে আসছে। এই বাজারের ফাঁকা অংশে মডেল মসজিদটি নির্মাণ করছি। সেখানে কিছু অবৈধ স্থাপনা আছে, সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)