শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
যশোরে তাপমাত্রা খুব বেশি না হলেও বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ঘাম ঝরানো এই আবহাওয়ায় শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বের হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। বিশেষ করে দিনমজুর, শ্রমিক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও খোলা আকাশের নিচে কর্মরত মানুষদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।
যশোর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২ জুন) যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে, বাতাসে আর্দ্রতা ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করায় প্রকৃত অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি মনে হয়।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আর্দ্রতা বেশি থাকলে শরীরের ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং মানুষের অস্বস্তি বাড়ে।
শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বাইরে বের হচ্ছেন না। রাস্তাঘাট, বাজার ও কর্মস্থলে কর্মরতদের অনেকেই ঘন ঘন পানি পান করছেন। দুপুরের পর থেকে শহরের মনণহার, জিরো পয়েন্ট, পৌর পার্ক, রেলগেট ও বকচর এলাকায় মানুষের হাঁটাচলায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। অনেক দোকানদার ও পথচারীকে বারবার মুখ ও মাথায় পানি দিতে দেখা গেছে।
রিকশাচালক মোমিন হোসেন বলেন, সকাল থেকে রিকশা চালাচ্ছি। রোদ আগের মতো তীব্র না হলেও গরমে শরীর ভিজে যাচ্ছে। বারবার পানি খেতে হচ্ছে। একটু পরপরই ক্লান্ত লাগছে।
পৌর পার্ক এলাকায় কাজ করা নির্মাণশ্রমিক রেজাউল ইসলাম বলেন, সারাদিন কাজ করতে গিয়ে প্রচুর ঘাম হচ্ছে। মাথা ঝিমঝিম করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পানি আর স্যালাইন খেতে হচ্ছে।
শহরের বকচর এলাকার গৃহিণী মায়া রানী বলেন, বাসার ভেতরেও অস্বস্তি লাগছে। ফ্যান চললেও গরম কমছে না। বাচ্চাদের বারবার পানি খাওয়াতে হচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বের হয়ে যাওয়ায় পানিশূন্যতা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমিভাব, রক্তচাপের ওঠানামা এবং তাপজনিত বিভিন্ন অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এদিকে, ভ্যাপসা গরমের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে হাসপাতালগুলোতেও। যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গরমজনিত অসুস্থ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে ডায়রিয়া, বমি, পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও জ্বরের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে।
মঙ্গলবার হাসপাতালে মোট ৫৮৭ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ১৭ জন এবং পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে অন্তত ৫৯ জন রোগী পানিশূন্যতা, দুর্বলতা ও জ্বরের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিলেন। একইদিনে বহির্বিভাগে চিকিৎসাপত্র নিয়েছেন এক হাজার ৯৭৭ জন রোগী। জরুরি বিভাগেও প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও রোগীর চাপ বাড়ছে বলে সিভিল সার্জন অফিস জানিয়েছে।
জেলা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, বর্তমানে তাপমাত্রার পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক বেশি থাকায় মানুষ বেশি অস্বস্তি অনুভব করছে। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে পানি ও ইলেকট্রোলাইট বের হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকের পানিশূন্যতা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও অন্যান্য তাপজনিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, যারা বাইরে কাজ করেন তারা অবশ্যই পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পান করবেন। বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজন হলে ওরস্যালাইন বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত স্যালাইন গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত স্যালাইন গ্রহণ করা উচিত নয়। শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে।
দুপুরের প্রচণ্ড ভ্যাপসা আবহাওয়ায় অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে গেলে ছাতা, টুপি বা হালকা রঙের সুতি পোশাক ব্যবহার করা উচিত। কারও মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, খিঁচুনি বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে বলে জানান ডা. রাসেল।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন যশোর অঞ্চলে বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তিও অব্যাহত থাকতে পারে।