সূর্য ওঠার আগেই ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার গৌরিনাথপুর বাজারে ভিড় করতে শুরু করেন কৃষকরা। স্থানীয় যান ছাড়াও ট্রাক কিংবা মোটরসাইকেলে করে তারা নিয়ে আসেন ক্ষেত থেকে সদ্য তোলা টাটকা ড্রাগন ফল। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে পাইকার, আড়তদার, শ্রমিক ও ক্রেতাদের ভিড়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জমে ওঠে দেশের অন্যতম বৃহৎ ড্রাগন ফলের পাইকারি বাজার।
প্রতিদিন এখানে গড়ে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ড্রাগন বেচাকেনা হয়। ভালো মৌসুমে কোনো কোনো দিন তা তিন কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যায়। স্থানীয়দের কাছে গৌরিনাথপুর এখন শুধু একটি বাজার নয়, দেশের ‘ড্রাগনের রাজধানী’ হিসেবেই পরিচিত।
ভারত সীমান্তঘেঁষা মহেশপুর উপজেলার গৌরিনাথপুরে গড়ে ওঠা এই বাজারে প্রতিদিন ঝিনাইদহের মহেশপুর, কোটচাঁদপুর, জীবননগর, যশোরের চৌগাছাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা ফল নিয়ে আসেন। এখান থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা ফল কিনে নিয়ে যান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর তথ্য মতে, ঝিনাইদহে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষ শুরু হয় ২০১৬ সালে। বর্তমানে জেলায় প্রায় দুই হাজার ২৫৯ জন কৃষক ড্রাগনের আবাদ করছেন। চলতি বছর এক হাজার ১২৯ হেক্টর জমিতে ড্রাগনের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মহেশপুর উপজেলাতেই রয়েছে ৩২০ হেক্টর, যা গত বছরের তুলনায় চার হেক্টর বেশি।
গৌরিনাথপুর গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম ২০১৬ সালে ৩৯ শতক জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তার ২২ বিঘা জমিতে ড্রাগনের বাগান।
তিনি বলেন, আগে ফল বিক্রির জন্য কোটচাঁদপুর বা ঝিনাইদহ শহরে যেতে হতো। এতে পরিবহন খরচ বাড়তো, সময়ও লাগতো বেশি। এখন ক্ষেত থেকে ফল তুলে সরাসরি নিজ গ্রামের বাজারে এনে বিক্রি করা যায়। নগদ টাকা পাওয়া যায়, কোনো ঝুঁকিও নেই। বছরে এক কোটি টাকার বেশি ড্রাগন ফল বিক্রি করেন বলে জানান এই চাষি।
জমজমাট বাজার
কৃষকদের সুবিধার কথা ভেবেই ২০২১ সালে স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন গৌরিনাথপুরে প্রথম ড্রাগনের আড়ত চালু করেন। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘সিয়াম-তাসিন ফল ভাণ্ডার’। পরে একে একে আরও আড়ত গড়ে ওঠে। বর্তমানে বাজারে আড়তের সংখ্যা ৮০টি। আর দোকান রয়েছে দুই শতাধিক।
জসিম উদ্দিন বলেন, আগে কৃষকদের দূরের বাজারে যেতে হতো। এখন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারেরা এখানে চলে আসেন। এতে কৃষকের খরচ কমেছে, একই সঙ্গে টাটকা ফলও দ্রুত বাজারজাত করা যাচ্ছে।
বাজারে কর্মরত এক শিক্ষার্থী মো. জাকির বলেন, ‘এখানে ড্রাগন বাজার গড়ে ওঠায় স্থানীয়ভাবে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি আমি একটি আড়তে কাজ করি। এখান থেকে প্রতি মাসে ১৮ হাজার টাকা বেতন পাই। আড়তগুলোতে ফল বাছাই, ওজন করা, প্যাকেজিং ও পরিবহনের জন্যও আলাদা আলাদা শ্রমিক নিয়োজিত থাকে। এসব কাজে যুক্ত ব্যক্তিরাও মাসে গড়ে ১০-১২ হাজার টাকা আয় করে।’
কৃষক মো. ময়নাল হোসেন বলেন, প্রথম বছরে এক বিঘা জমিতে ড্রাগনের বাগান করতে প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ হয়। তবে পরের বছরগুলোতে পরিচর্যার খরচ কমে এক লাখ টাকার নিচে নেমে আসে। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘা থেকে চার লাখ টাকারও বেশি ফল বিক্রি সম্ভব।
হক ফল ভাণ্ডারের মালিক নাজমুল হক বলেন, কৃষকের কাছ থেকে নির্ধারিত কমিশনে ফল বিক্রি করা হয়। লেনদেন হয় নগদে। বাজারে স্বচ্ছতা থাকায় কৃষক ও পাইকার উভয়ের আস্থা তৈরি হয়েছে।
ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, গৌরিনাথপুরে ভালো মানের টাটকা ড্রাগন পাওয়া যায়। এখান থেকে ফল কিনে ঢাকার কারওয়ান বাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।
এসআর ফল ভাণ্ডারের মালিক রায়হান খান বলেন, ‘বর্তমানে ড্রাগনের দাম অনেক কম; ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা কেজি। আশা করছি কয়েক দিনের মধ্যে দাম উঠবে।’
তিনি বলেন, বাজারে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ফল বিক্রি হয়। দাম ভালো থাকলে বেচাকেনা তিন কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যায়।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান জানান, ড্রাগনের আদি নিবাস মেক্সিকো ও লাতিন আমেরিকায়।
তিনি বলেন, ‘গৌরিনাথপুর বাজারের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে নিয়ে আমরা একটি সেমিনারের আয়োজন করেছি। ফলের বাজারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করছেন। আমাদের লক্ষ্য, কোনো কৃষক বা ব্যবসায়ী যেন ড্রাগন ফলে কোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করতে না পারে।’
গৌরীনাথপুরের এই বাজারকে কেন্দ্র করে সীমান্ত অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।