যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ভাঙা ছাদ জানালা, বিষাক্ত পানিবেষ্টিত স্কুলে লেখাপড়া

ইমরান হোসেন রাজ

, যশোর

প্রকাশ : সোমবার, ১৩ জুলাই,২০২৬, ১১:০০ এ এম
ভাঙা ছাদ জানালা, বিষাক্ত পানিবেষ্টিত স্কুলে লেখাপড়া

মাথার ওপর থাকা ছাদ থেকে পলেস্তরা খসে পড়ছে। শ্রেণিকক্ষের ভাঙা জানালা দিয়ে বৃষ্টির পানি আসছে। ঠিক পেছনে স্থানীয়দের গৃহস্থালীর আবর্জনা ও থিকথিকে কাদাসম্বলিত নালা। আর মাঠের মধ্যে ঢুকছে কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যাল।

এই হলো যশোর শহরতলীর নামেজ সরদার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একই কম্পাউন্ডে থাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাল। প্রায় অর্ধশতকের ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিতে এখন আর পড়াশুনার পরিবেশ নেই। আক্ষেপ করে এলাকাবাসী বলছেন, এটি দেখাশোনার কোনো কর্তৃপক্ষ আছে বলে মনে হয় না।

যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের নামেজ সরদার মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি থেকে পাস করে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বহু মানুষ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরে উচ্চপদে কর্মরত আছেন। সেই গৌরবময় ইতিহাস এখন অবহেলা, প্রশাসনিক উদাসীনতা আর অবকাঠামো সংকটে ধুসর হতে চলেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠের পুব পাশে ১৯৯৫ সালে নির্মিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একতলা ভবনটি জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ছে। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে ভেসে যায় শ্রেণিকক্ষ। জানালাগুলো ভেঙে যাওয়ায় বৃষ্টির ছাঁটে শিক্ষার্থী ও তাদের বই-খাতা ভিজে একাকার হয়।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলে, ‘প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ভাবি, আজ সুস্থভাবে বাড়ি ফিরতে পারবো তো? ক্লাস করার সময় আমাদের সহপাঠীদের মাথায় বালির দলা ও ছাদের অংশ খসে পড়ে। শিক্ষকরাও আতঙ্কে থাকেন। আমাদের তো আর কোনো উপায় নেই, তাই বাধ্য হয়েই ঝুঁকির নিয়ে ক্লাস করতে হচ্ছে।’

শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকটের কারণে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা এক শিফটে নিতে পারছে না। বাধ্য হয়ে দুই শিফটে পরীক্ষা নিতে হচ্ছে বলে জানান প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে একটি দ্বিতল ভবনের কাজ অর্ধেক সম্পন্ন করা হলেও তা চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।

শুধু বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবনই নয়, বিদ্যালয়টির পরিবেশও বিষিয়ে উঠেছে। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র মোমিনুল ইসলাম মাইনসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, বিদ্যালয়ের একদম পাশ দিয়ে এলাকার বাড়িঘরের ময়লা-আবর্জনা নিষ্কাশনের একটি খোলা ড্রেন চলে গেছে। এই খোলা ড্রেনের তীব্র দুর্গন্ধে ক্লাস করা শিক্ষার্থীদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রেনের কারণে মশা-মাছির উপদ্রব যেমন বেড়েছে, তেমনি বাতাসে ছড়াচ্ছে মারাত্মক জীবাণু। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিদ্যালয়ে তাদের উপস্থিতির হারও কমে যাচ্ছে।

চারপাশের গ্রামের সমতলের চেয়ে বিদ্যালয়ের মাঠটি নিচু হওয়ায় বছরের অধিকাংশ সময় পানি জমে থাকে। সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পেছনে গড়ে ওঠা বিভিন্ন বাড়িঘর, গ্যারেজ এবং বিশেষ করে ‘অ্যাথার্টন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ও বিষাক্ত কেমিক্যালযুক্ত পানি স্কুলের মাঠে এসে পড়ছে।

নোংরা পানির কারণে মাঠে শামুকের উপদ্রব বেড়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা মাঠে নামলেই তাদের পা কেটে যায়। বিষাক্ত পানির সংস্পর্শে পায়ে চুলকানি হয়।

বিদ্যালয়ের ২০০৬ সালের প্রাক্তন ছাত্র শিহাবুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের শৈশব কেটেছে এই মাঠে। অথচ স্থানীয় প্রাইমারি ও হাইস্কুল মিলে প্রায় ১৫০০-১৬০০ শিক্ষার্থীর খেলাধুলার একমাত্র জায়গাটি আজ বিষাক্ত পানির নিচে ডুবে আছে।’

এই বিষয়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান অ্যাথার্টন-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিপ্লবের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি ক্যামেরার সামনে বা লিখিত কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি ও মাঠের বেহাল দশা নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান শিকদার বলেন, “১৯৯৫ সালে তৈরি হওয়া একমাত্র ভবনটির অবস্থা এতই জরাজীর্ণ যে, শিক্ষার্থীদের ভেতরে বসিয়ে ক্লাস করাতে আমরা আতঙ্কে থাকি। কখন যে বড় দুর্ঘটনা ঘটে যায়! বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। তারা শুধু বলেন, ‘আপনারা আপনাদের মতো তৈরি করে নেন।”

তবে ভিন্ন সুর শোনা গেল সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তার মুখে। যশোর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাদিউজ্জামান খান বলেন, ‘নামেজ সরদার স্কুল থেকে কোনো বড় বরাদ্দ বা মেরামতের জন্য লিখিত চাহিদা আমাদের কাছে দেওয়া হয়নি। চাহিদা দিলে আমরা তা প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পত্র দেবো। বিগত অর্থবছরে এমন কোনো চিঠি এসেছিল কি না, তা ফাইল ঘেঁটে দেখতে হবে।’

এদিকে, বিদ্যালয়ের ঠিক পশ্চিম পাশ দিয়েই চলে গেছে যশোর-চুকনগর আঞ্চলিক মহাসড়ক। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীকে ঝুঁকি নিয়ে এই রাস্তা পার হতে হয়। এখানে কোনো গতি-নিরোধক (স্পিড ব্রেকার) বা রোড ডিভাইডার না থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকেন অভিভাবকরা।

বিদ্যুৎ ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বাবা মরহুম তরিকুল ইসলামের হাত ধরে ১৯৯৫ সালে এই স্কুলের প্রথম সরকারি ভবনটি গড়ে উঠেছিল। কালের পরিক্রমায় সেই ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং শিশুদের স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষার্থে অনতিবিলম্বে একটি নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ, মাঠের পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার এবং মহাসড়কে গতি-নিরোধক স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চান বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকরা।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)