স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
গত অর্থবছরে যশোরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ও সংগঠনের জন্য সরকারের বরাদ্দ করা প্রায় সাড়ে ২৯ লাখ টাকার অনুদান বিতরণকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
জেলার একাধিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের অভিযোগ, অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সংগঠনের একটি বড় অংশ নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এমনকী কিছু সংগঠন কেবল কাগজে-কলমে রয়েছে বলেও দাবি তাদের।
অন্যদিকে জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমি বলছে, চূড়ান্ত তালিকা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত হয়ে আসে এবং তারা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কেবল অনুদান বিতরণ করে থাকে।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিল্পকলা শাখা থেকে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে যশোর জেলার ৫৮ জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জন্য নয় লাখ ৭১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৪২টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য ১৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়ে চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারের কাছে দুটি পৃথক পত্র পাঠানো হয়। দুই খাতে মোট অনুদানের পরিমাণ ২৯ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমি অনুদানের চেক বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জেলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ও সংগঠনকে অনুদান দিয়ে আসছে সরকার। আবেদন গ্রহণের জন্য সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসে জেলা শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ব্যক্তিপর্যায়ে আবেদনপত্রে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ, আবেদনকারীকে চেনেন এমন দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়সহ ১৫টি তথ্য দিতে হয়। অন্যদিকে, সংগঠনের ক্ষেত্রে সংস্থার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, গত এক বছরের কার্যক্রম, আয়োজিত অনুষ্ঠানের সচিত্র প্রমাণ, নিবন্ধনসহ ১৩টি তথ্য সংযুক্ত করতে হয়। আবেদনপত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অথবা জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমির কর্মকর্তার সুপারিশ বাধ্যতামূলক। পরে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত ৯ সদস্যের কমিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠায়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদিত হয়।
তবে এবারের অনুদান তালিকা প্রকাশের পর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কয়েকজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের দাবি, ৫৮ জন অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তির মধ্যে অনেকেই নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। একইভাবে অনুদানপ্রাপ্ত ৪১টি সংগঠনের মধ্যে অন্তত ১৭টির বছরে কোনো কার্যক্রম নেই এবং আরও ছয়টি সংগঠন বছরে মাত্র একটি করে অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই কেবল কাগজে-কলমে সক্রিয় থেকে সরকারি অনুদান পাচ্ছে।
ব্যাঞ্জন থিয়েটারের সভাপতি ও যশোর ইনস্টিটিউটের সদস্য আনিসুজ্জামান পিন্টু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, অনুদানপ্রাপ্ত সংগঠনগুলোর মধ্যে ১০ থেকে ১২টি সংগঠন বাস্তব অর্থে সক্রিয়। বাকিগুলো নিষ্ক্রিয় বা কেবল অনুদান গ্রহণের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছে। একইভাবে ৫৮ জন সাংস্কৃতিক ব্যক্তির মধ্যে মাত্র ৮ থেকে ১০ জন সক্রিয়, ২০ থেকে ২৫ জন নিষ্ক্রিয় এবং বাকিদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, বছরের পর বছর কীভাবে যাচাই-বাছাই ছাড়াই একই ধরনের ব্যক্তি ও সংগঠন অনুদানের তালিকায় স্থান পাচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়ায় কারা ভূমিকা রাখছেন।
এ বিষয়ে যশোর জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমির কালচারাল অফিসার জসিম উদ্দীন বলেন, অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সংগঠনের চূড়ান্ত তালিকা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত হয়ে আসে। জেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমি ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কেবল অনুদান বিতরণের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তবে অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা সংগঠন নিয়ে যদি কোনো অনিয়ম, অসঙ্গতি বা অভিযোগ থাকে, তাহলে তথ্য-প্রমাণসহ তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনলে বিষয়টি পর্যালোচনা করা সহজ হবে। ভবিষ্যতে যাতে প্রকৃত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সক্রিয় সংগঠনগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, ‘জেলা থেকে সুপারিশ না গেলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমি নিজেরা এসে তালিকা তৈরি করে না। তাই সুপারিশ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্থানীয় কর্তৃপক্ষের। আমাদের সন্দেহ, পক্ষপাতিত্ব বা অন্য কোনো প্রভাবের কারণে কিছু ব্যক্তি ও সংগঠনের নাম সুপারিশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকায় এমন অনেক ব্যক্তি ও সংগঠনের নাম রয়েছে, যাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জেলার মূলধারার সংস্কৃতিকর্মীরাও অবগত নন। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে জানতে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনকল রিসিভ করেননি। তাছাড়া, মোবাইলফোনে টেক্সট পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।