যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশ এখন বিলাসিতা

সাইফুল ইসলাম কবির

, বাগেরহাট

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই,২০২৬, ১০:০০ এ এম
পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশ এখন বিলাসিতা

একসময় বর্ষা এলেই পানগুছি ও বলেশ্বর নদ যেন রুপালি আলোয় ঝলমল করে উঠতো। আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা মৌসুমে জেলেদের নৌকা ফিরতো ইলিশে ঠাসা হয়ে। ঘাটে নৌকা ভেড়ার আগেই অপেক্ষায় থাকতেন পাইকার ও ক্রেতারা। শরণখোলা আর মোরেলগঞ্জের মাছ বাজারে তখন পা ফেলার জায়গা থাকতো না। হালি ধরে ইলিশ বিক্রি হতো, আর ক্রেতারা কলাপাতার রশিতে গেঁথে সেই ইলিশ কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরতেন। উপকূলের মানুষের কাছে সেটি ছিল বর্ষার আনন্দ, ঐতিহ্য আর প্রাচুর্যের অনন্য প্রতীক। সেই দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না।

সুন্দরবনসংলগ্ন পানগুছি-বলেশ্বর নদ এখনও ইলিশের জন্য বিখ্যাত। স্বাদ, গন্ধ, তেলের পরিমাণ ও গড়নের কারণে এখানকার ইলিশের কদর দেশের সর্বত্র। পদ্মার ইলিশের মতোই পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশও ভোজনরসিকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের নাম। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের ইলিশ আজ সাধারণ মানুষের থালায় নয়, ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বিলাসী খাদ্যের তালিকায়।

সরবরাহ কমেছে, দাম বেড়েছে, একই সঙ্গে কমেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। ফলে নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছেও এখন ইলিশ কেনা যেন উৎসবের বদলে দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত।

স্থানীয়দের ভাষ্য, পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশের পেটি তুলনামূলক চওড়া এবং তেলের পরিমাণ বেশি। এ কারণে এর স্বাদ অন্য নদীর ইলিশের তুলনায় আলাদা। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকা, খুলনা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও মানুষ ছুটে আসেন শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জের বাজারে। অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের জন্য বরফবিহীন টাটকা ইলিশ কিনে নিয়ে যান। কিন্তু এখন সেই চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়েনি সরবরাহ।

শরণখোলার রায়েন্দা মাছ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে ছোট জাটকা ইলিশও কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায়। মাঝারি ও বড় আকারের ইলিশের দাম উঠেছে তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত।

এই বাজারে দাঁড়িয়ে হতাশা লুকাতে পারেন না স্থানীয় গৃহিণী শাকিলা সুলতানা অথি। তার কথায়, বাজারে ইলিশ খুব কম আসে। যা পাওয়া যায়, তার দাম এত বেশি যে সাধারণ পরিবারের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়।

ওয়ার্কশপ ইঞ্জিনিয়ার টিটু হাওলাদারের কণ্ঠেও একই আক্ষেপ। তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। কয়েক হাজার টাকা দিয়ে ইলিশ কেনা এখন স্বপ্নের মতো।

অন্যদিকে নদীতে জাল ফেলেও আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা। রায়েন্দা বেড়িবাঁধ এলাকার জেলে মনির হোসেন বলেন, কয়েক বছর আগেও বলেশ্বর নদে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। এখন অনেক সময় জাল টেনেও খালি হাতে ফিরতে হয়। দু-একটি ছোট ইলিশ ধরা পড়লেও বড় ইলিশ খুব কমই মিলছে।

তবে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে জেলেদের জালে কিছুটা বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়তে শুরু করেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ৮০০ গ্রাম থেকে শুরু করে দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের ইলিশও উঠছে। এতে জেলেদের মধ্যে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

রায়েন্দা মাছ বাজারের ব্যবসায়ী বেল্লাল হোসেন বলেন, নদী ও সাগরে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় জেলেদের কাছ থেকেই বড় ইলিশ তিন থেকে চার হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। ফলে বাজারে দাম কমানোর সুযোগ নেই।

মাছ ব্যবসায়ী সোহাগের মতে, দাম যতই বাড়ুক, ইলিশের প্রতি মানুষের আবেগ কমেনি। তবে এখন বড় ইলিশের প্রধান ক্রেতা সরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা। সাধারণ মানুষ দাম শুনেই ফিরে যাচ্ছেন।

শরণখোলা উপজেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আবুল হোসেনের মতে, অবৈধ চরঘেরা, বেন্দিজাল দিয়ে জাটকা নিধন, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অতিরিক্ত মাছ আহরণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইলিশের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তবে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা আশার কথাই শোনাচ্ছেন। মোরেলগঞ্জ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা বিনয় কুমার রায় বলেন, সাগর ও পানগুছি-বলেশ্বর নদে পর্যাপ্ত ইলিশ রয়েছে। ভাদ্র-আশ্বিনে মূল মৌসুম শুরু হলে সরবরাহ আরও বাড়বে। বর্তমানে মৌসুম শুরুর আগের সময় হওয়ায় মাছ কম ধরা পড়ছে, তাই দামও বেশি।

তিনি জানান, পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশের বৈশিষ্ট্যই একে অন্য নদীর ইলিশ থেকে আলাদা করেছে। এতে তেলের পরিমাণ বেশি, পেটিও চওড়া। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এখন ইলিশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ নদীতে প্রবেশ করছে।

একসময় আষাঢ়-শ্রাবণের বাজার মানেই ছিল ইলিশের উৎসব। সেই উৎসব আজ অনেকটাই ফিকে। যে মাছ একসময় উপকূলের মানুষের নিত্যদিনের খাদ্যতালিকার অংশ ছিল, সেটিই এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশ এখনও স্বাদ, ঐতিহ্য ও আবেগের প্রতীক। কিন্তু বাজারের ঊর্ধ্বমুখী দাম আর অর্থনৈতিক বাস্তবতা সেই ঐতিহ্যকে ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে সামর্থ্যবানদের খাবারের টেবিলে। এখন ক্রেতাদের অপেক্ষা ভরা মৌসুমের। তাদের বিশ্বাস, নদীতে ইলিশের সরবরাহ বাড়লে হয়তো দামও কিছুটা কমবে। আর তখন আবারও উপকূলের বাজারে ফিরবে সেই বহুদিনের চেনা রুপালি হাসি।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)