সম্পাদকীয়
প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাসের সাক্ষী যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করলেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটিই এই লাইব্রেরিতে কোনো সরকারপ্রধানের আগমন।
ব্রিটিশ ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীন গণপাঠাগারটিতে রক্ষিত তালপাতার পুঁথি ও অন্যান্য দুর্লভ গ্রন্থের সম্ভার প্রধানমন্ত্রীকে যেমন মুগ্ধ করেছে, তেমনি এই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক প্রতিষ্ঠানটির কিছু সংকটও তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। লাইব্রেরির উদ্যোগে আর বইমেলা না হওয়ার তথ্য জানতে পেরে তিনি যে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন; যা শুধু একজন সরকারের প্রধান নির্বাহীর নয়, বরং একজন সংবেদনশীল পাঠকের প্রতিক্রিয়া।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অত্যন্ত সময়োপযোগী। নিয়মিত বইমেলা আয়োজনের মাধ্যমে পাঠাগারটিকে আবারও এই অঞ্চলে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনার তাগিদ তিনি দিয়েছেন। সেইসঙ্গে যশোর ইনস্টিটিউটের সুবিধা বৃদ্ধিতে জেলা প্রশাসককে তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার নির্দেশনা বাস্তবসম্মত প্রশাসনিক উদ্যোগ।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল শিশু প্রসঙ্গে। আজকের ডিজিটাল যুগে শিশুরা যখন মোবাইল ফোনের কৃত্রিম আলোয় জ্ঞানের বদলে বিনোদনে ডুবে যাচ্ছে, সেখান থেকে তাদের ফিরিয়ে আনার বাস্তবধর্মী আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের রূপরেখার ইশারা হিসেবে গণ্য করা যায়। ইতিহাসের সাক্ষী এ ধরনের গ্রন্থাগারগুলো কেবল বইয়ের ভান্ডার নয়, বরং চিন্তার চর্চাকেন্দ্র, বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির আঙিনা। যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি যদি আবার নিয়মিত বইমেলার আয়োজন করে, তাতে লেখক-পাঠকের সেতুবন্ধন রচিত হবে, নতুন লেখক ও পাঠক তৈরি হবে। আর জেলা প্রশাসন যদি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত পথে গ্রন্থাগারের বহুমুখী উন্নয়নে উদ্যোগী হয়, তবে যশোরের এই প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যান্য গ্রন্থাগারের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
অতএব, সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, যশোর ইনস্টিটিউটের কার্যনির্বাহী পরিষদসহ সুধীজন, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। মাঠ পর্যায়ে পড়ুয়াদের জন্য পাঠাগার-ভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, গল্প বলা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা প্রয়োজন। একমাত্র সম্মিলিত প্রয়াসেই আমরা শিশু-কিশোরদের টেকনোলজির নেশা থেকে বইয়ের নেশায় ফিরিয়ে আনতে পারবো। যশোরের ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থাগার যেন আবার জ্ঞানের জ্যোতির্ময় কেন্দ্রে পরিণত হয়, প্রধানমন্ত্রীর আজকের সেই প্রত্যাশা ও নির্দেশনা যেন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং বাস্তবায়নে রূপ নেয়, এটাই এখন আমাদের প্রত্যাশা।
জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা এবং গ্রন্থাগারকে প্রাণবন্ত রাখার অঙ্গীকারই পারে একটি প্রগতিশীল ও শিক্ষানুরাগী জাতি গঠনে সহায়তা করতে।