স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
প্রেমের টানে ঘর বেঁধেছিলেন মামাতো-ফুফাতো ভাই বোন। রঙিন স্বপ্নে সাজাতে চেয়েছিলেন নতুন সংসার। কিন্তু সেই স্বপ্নকে চার মাসের মাথায় কেড়ে নিল মরণনেশা মাদক। মাদকের টাকার জন্য স্ত্রী ছামিনা আক্তার সাম্মিকে (২০) নৃশংসভাবে খুন করে নিজের বুকেও ছুরি চালিয়েছেন স্বামী সুজন (২২)।
সোমবার (৮ জুন) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে যশোর সদর উপজেলার শেখহাটি তমালতলা এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে।
নিহত গৃহবধূ ছামিনা আক্তার সাম্মি যশোর সদর উপজেলার তরফ নওয়াপাড়া এলাকার শফিয়ার রহমানের মেয়ে। তার স্বামী সুজন টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলার গয়হাটা ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে। বর্তমানে সুজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহতের মামা মোস্তাফিজুর রহমান পিয়াস ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের জেরে বাবা-মাকে না জানিয়ে চার মাস আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুজন ও ছামিনা। বিয়ের পর সাম্মি জানতে পারেন তার স্বামী সুজন মাদকাসক্ত। এরপর থেকেই তাদের সংসারে অন্ধকার নেমে আসে। নেশার টাকার জন্য প্রায়ই ছামিনাকে মারধর ও কলহ সৃষ্টি করতেন সুজন। এমনকি মাদকের টাকার জন্য সুজন হিংস্র হয়ে গত শুক্রবার নিজের জন্মদাত্রী মাকেও ছুরিকাঘাত করে আহত করেন।
স্বামীকে এই অন্ধকার জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন ছামিনা। পরিবার দুটিও সুজনকে সুপথে আনতে বিদেশে পাঠানোর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। সোমবারই (৮ জুন) সুজনের মালয়েশিয়া যাওয়ার বিমানের টিকিট কাটার কথা ছিল। কিন্তু স্বামীর উড্ডয়নের আগেই চিরতরে উড়ে গেল একটি নিষ্পাপ প্রাণ।
পুলিশ ও প্রতিবেশী আজিবার বিশ্বাস জানান, সোমবার ভোরে শেখহাটি তমালতলা এলাকার ইমরাজের ভাড়া বাড়িতে নেশার টাকা নিয়ে সুজন ও ছামিনার মধ্যে তীব্র কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সুজন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মারপিটের পর ধারালো চাকু দিয়ে ছামিনার সমস্ত শরীরে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকেন। ছামিনার আর্তচিৎকারে বাড়ির লোকজন ও প্রতিবেশীরা ছুটে এসে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাকিরুল ইসলাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, স্ত্রীকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার পর সুজন নিজের শরীরেও চাকু দিয়ে আঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকেও উদ্ধার করে একই হাসপাতালের পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুজনের ওপর হামলার চেষ্টা করেন ছামিনার কয়েকজন স্বজন। এতে হাসপাতাল চত্বরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে সুজনের বাবা ও মাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক সাকিরুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে আনার আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। নিহতের মরদেহ পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। জখম স্বামী সুজন পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী বাবুল বলেন, মাদকাসক্তির জেরে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুজনের বাবা-মাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।