নড়াইল ও লোহাগড়া প্রতিনিধি
লোহাগড়া উপজেলার লক্ষ্মীপাশা গ্রামে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে মানুষের চলাচলের একটি রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এতে অন্তত ২৫টি জেলে পরিবারের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে, চরম ভোগান্তিতে পড়েছে ওই পরিবারগুলো। অবশ্য, অভিযুক্তের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- তাদের চলাচলের পথ রয়েছে। সংখ্যালঘু তকমা লাগিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তারা বাড়ির মূল জায়গায় পকেট গেট বন্ধ করছেন সমাজবিরোধীদের জন্যে।
গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত আটজন শ্রমিক সেখানে এই সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, লক্ষ্মীপাশা মৌজার সাবেক দাগ নং ২৬১ ও আর.এস ২০২৮ দাগের ৬ শতক জমি দীর্ঘদিন ধরে তাদের একমাত্র যাতায়াতের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ব্রিটিশ আমল থেকে প্রচলিত এ পথটি এসএ, আএস নকশা ও আরএস পর্চায় ১/১ খতিয়ানে সরকারি রাস্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে, সম্প্রতি এলাকার দেদার-ই-এলাহী ও তার সহযোগীরা ওই জমিতে নতুন করে প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেন। এতে গ্রামের ভেতরের বসতবাড়ির সঙ্গে যাতায়াতের সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী এক বাসিন্দা বলেন, এই রাস্তা দিয়েই আমরা বহু বছর ধরে চলাচল করছি। হঠাৎ করে প্রাচীর তুলে দেওয়ায় এখন ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই।
অবরুদ্ধ হয়ে পড়া হারানচন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ব্যারিস্টার দেদার-ই-এলাহী ও তার সহযোগীরা পথটি এর আগে দুইবার বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রশাসনের সহায়তায় দুই বার ভেঙে দেওয়া হয়। নতুন করে গত বৃহস্পতিবার তারা আবার প্রাচীর নির্মাণ করেছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি।
পথ আটকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করায় অবরুদ্ধ হয়ে থাকা ভ্যানচালক ধ্রুব বিশ্বাস বলেন, পথ বন্ধ করায় ভ্যান নিয়ে বের হতে পারিনি। ভ্যানের পরেই আমার রুজি- রিজিক। মালোপাড়ায় ২৫টি ঘর আছে। এই পথটা যাওয়া-আসার রাস্তা। আমরা বাড়ি থেকে বের হতে পারছি না, আয় ইনকাম বন্ধ। নদীতে গোসলে যাবো তাও যেতে পারছি না। সংখ্যালঘু হওয়ায় আমাদের প্রতি এই নির্যাতন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধের জেরে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে নিম্ন আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও তা অমান্য করে প্রাচীর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
জেলে পরিবারের সদস্য সুশান্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, আমাদের ২৫টি জেলে পরিবারকে বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করতে দেদার-ই-এলাহী তার লোকজন নিয়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করেছেন। চলাচলের শতবর্ষী এ পথ বন্ধ করে বারবার হয়রানি করা হচ্ছে। এর আগে ও তারা দুইবার পথটি বন্ধ করে তারা। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা প্রশাসককে জানিয়েছি।
স্থানীয় বাসিন্দা স্বপ্না বিশ্বাস জানান, পথটি বন্ধ করে দেওয়ায় কেউ বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। বাঁশের মই দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বাড়ির মহিলারা কয়বার মই বেয়ে যাতায়াত করবে?
ব্যারিস্টার দেদার-ই-এলাহীর সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রবেশ পথের ওই রাস্তাটা পাঁচ শতক। আমাদের টোটাল বাড়ির সাথে কেনা। এটা যে কোনোভাবে ‘ক’ তালিকায় চলে যায়। এ বিষয়ে আমরা কোর্টে মামলা করেছি। রায় হয়েছে। সরকার আপিল করছে। সেখানে ও আমরা কন্সেন্ট করছি। তার পর ডিসি অফিস থেকে চার-পাঁচ বছর আগে অবমুক্ত করে দিয়েছে। এখন যে জায়গাটা প্রাচীর দেওয়া হয়েছে, ওই জায়গা মামলার ভেতর নাই। ওখানকার জেলেরা রাস্তা চেয়ে একটি মামলা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘উপজেলা ভূমি অফিস থেকে একবার তদন্ত করা হয়েছিল। তারা সরেজমিনে গিয়ে দেখে এসেছে তাদের বের হওয়ার দুটি রাস্তা রয়েছে। স্কুল মাঠ থেকে দশ ফুট চওড়া একটি রাস্তা আছে। এখন তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংখ্যালঘু তকমা দিচ্ছে। আমরা ঢাকায় থাকি, বাড়িতে কেউ থাকে না। ওই বাড়ির সীমানায় মদ, গাঁজার আসর বসানো হয়। এই কারণে পকেট গেটটা বন্ধ করেছি।’
লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাম্মী কায়সার বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। আগামী রোববার দুইপক্ষকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ অফিসে ডাকা হয়েছে। উভয়পক্ষের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’