বাগেরহাট প্রতিনিধি
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বদনিভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম ইমন। তিনি হেমায়েত হোসেনের মেজ ছেলে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এই ব্যক্তি বর্তমানে আহতদের সংগঠন ‘আমরা জুলাইযোদ্ধা ফাউন্ডেশন’-এর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
২০২৪ সালের ২০ জুলাই। দেশজুড়ে কারফিউ। সেনাবাহিনীর টহল জোরদার। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলছিল। সেদিন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন নয়াপল্টন ও রমনা এলাকায় অবস্থান করছিলেন আমিনুল ইসলাম ইমন, যিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেলে তিনি বাসায় ফেরার উদ্দেশে রওনা হন। পল্টন, গুলিস্তান ও সেগুনবাগিচা এলাকা অতিক্রম করে মালিবাগ রেলগেট এলাকায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ গুলির মুখে পড়েন।
আমিনুল ইসলাম ইমন বলেন, ‘সেদিন বিকেলে যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নের সঙ্গে কয়েক দফা কথা হয়। পরে তাকে মোটরসাইকেলে নিয়ে আমরা বাসার দিকে ফিরছিলাম। মালিবাগ রেলগেটে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকটি গাড়ি থেকে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া শুরু হয়। পেছনে বসা রবিউল ইসলাম নয়ন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। আমিও মোটরসাইকেলসহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ি।’
তিনি বলেন, ‘মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর কয়েকজন এসে তার শরীরে ছররা গুলি করে। তখনও কিছুটা জ্ঞান ছিল। শরীর নিস্তেজ হয়ে গেলে তাকে মৃত ভেবে ড্রেনের পাশে ফেলে রাখা হয়। সেখানে দেখি আশপাশে আরও কয়েকটি মরদেহ পড়ে আছে।’
‘সামান্য নড়াচড়া করলে আবার তার ডান পায়ে গুলি করা হয়। গুলিটি পায়ের এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। তখন বুঝতে পারছিলাম, হয়তো আর বাঁচবো না। স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ছিল। আল্লাহর কাছে শুধু প্রার্থনা করছিলাম, অন্তত আমার লাশ যেন পরিবার খুঁজে পায়,’ বলছিলেন ইমন।
দীর্ঘ সময় আহত অবস্থায় পড়ে থাকার পর স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে তাকে উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার পর চালকের কাছ থেকে মোবাইলফোন নিয়ে ছেলেকে শুধু বলতে পেরেছিলাম, আমি গুলি খেয়েছি, ঢাকা মেডিকেলে আসো। এরপর আবার জ্ঞান হারাই।’
ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পথে কয়েকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে তার অবস্থা জানতে চেয়েছিলেন। তবে চালক তাকে মৃত বলে জানালে আর তল্লাশি করা হয়নি।
আমিনুল ইসলামের ভাষ্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর পর প্রথমে তাকে মৃত ভেবে ফেলে রাখা হয়। পরে শরীরে নড়াচড়া দেখে চিকিৎসা শুরু করেন ডাক্তাররা। অবস্থার অবনতি হলে তাকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। একাধিক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত তার গুলিবিদ্ধ ডান পা কেটে ফেলতে হয়।
পরবর্তীতে সাভারের সিআরপিতে দীর্ঘ পুনর্বাসন চিকিৎসা শেষে তিনি নতুন জীবন ফিরে পান।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে আন্দোলনে আহত অনেকের দুর্ভোগ ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত সমস্যার কথা জানতে পারেন আমিনুল। পরে আহতদের অধিকার ও সহায়তার লক্ষ্যে কয়েকজনকে নিয়ে ‘আমরা জুলাইযোদ্ধা ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলেন।
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসাধীন ৮০ জনের বেশি আহত একত্রিত হয়ে এই সংগঠন গড়ে তুলি। এরপর ধীরে ধীরে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আহতদের নিয়ে কাজ শুরু।’
‘জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আহত ও নিহত সবাইকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে এবং তাদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে,’ দাবি ইমনের।