শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
জ্যৈষ্ঠের শুরুতেই আগুনঝরা রোদ আর তীব্র তাপদাহে হাঁসফাঁস অবস্থা যশোরবাসীর। দিন যতো গড়াচ্ছে, তাপমাত্রাও ততো বাড়ছে।
রোববার যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৫৬ শতাংশ। ফলে, তাপমাত্রা আরও বেশি অনুভূত হয়েছে। ভ্যাপসা গরমে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুপুরের পর শহরের সড়কগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়, আর খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ পড়েছেন সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে।
যশোর বিমানবন্দর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রোববার জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৩৬.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৫৬ শতাংশ। আর্দ্রতা বেশি থাকলে শরীরের ঘাম সহজে শুকায় না। ফলে গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এ কারণে ৩৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা মানুষের কাছে ৪১ থেকে ৪২ ডিগ্রির মতো অনুভূত হচ্ছে।
এর আগে শনিবার তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি, শুক্রবার ছিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
টানা কয়েকদিন ধরেই দেশের সবচেয়ে উষ্ণ জনপদগুলোর তালিকায় রয়েছে যশোর।
শহরের চৌরাস্তা, দড়াটানা, রেলগেট, মণিহার, বকচর, পালবাড়ি ও বেজপাড়া এলাকায় দুপুরের পর মানুষের চলাচল অনেক কমে যায়। প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বের হচ্ছেন না। যারা বের হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশের হাতে দেখা গেছে ছাতা, পানির বোতল কিংবা ভেজা গামছা।
দুপুরের দিকে শহরের পিচঢালা সড়কগুলো থেকে যেন আগুনের তাপ বের হতে দেখা যায়। গরম বাতাসে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলাই কষ্টকর হয়ে ওঠে। রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক চালকদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক।
ষষ্ঠীতলা এলাকার রিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, রোদে বের হলেই মনে হয় আগুনের মধ্যে আছি। একটু রিকশা চালালেই পুরো শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। অনেক সময় মাথা ঘুরে আসে।
শেখহাটি বাবলাতলা এলাকার আরেক রিকশাচালক মমিন হোসেন বলেন, গরমে মানুষ কম বের হচ্ছে। যাত্রীও কমে গেছে। কিন্তু আমাদের তো বসে থাকলে চলবে না। পেটের দায়ে রাস্তায় নামতেই হচ্ছে।
শহরের হাসপাতাল মোড় এলাকায় আখের রস বিক্রি করেন তৈয়ব মিয়া। প্রচণ্ড গরমে তার দোকানে বেড়েছে ক্রেতার ভিড়। তিনি বলেন, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আখের রস, লেবুর শরবত আর ঠান্ডা পানির চাহিদাও বেড়েছে। অনেকে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই এসে শরবত খাচ্ছেন।
তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন দিনমজুর ও নির্মাণশ্রমিকরা। অনেকেই দুপুরের কাজ বন্ধ রেখে সকাল ও বিকেলে কাজ করার চেষ্টা করছেন। তবে জীবিকার তাগিদে অনেককে আবার প্রখর রোদের মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে।
যশোর সদরের শানতলার কৃষক সেলিম হোসেন বলেন, সকালের পর মাঠে দাঁড়ানোই কষ্টকর। মাথার ওপর আগুন ঝরে।
অতিরিক্ত গরমে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে জ্বর, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া ও হিটস্ট্রোকজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল জানান, গরমের কারণে যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জ্বর, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া ও ফ্লুজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
তার পরামর্শ, প্রচণ্ড গরমে বেশি বেশি পানি, স্যালাইন ও ডাবের পানি পান করতে হবে। বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়াই ভালো। বাইরে বের হলে ছাতা, টুপি বা হালকা রঙের পোশাক ব্যবহার করা উচিত। একাধারে কাজ না করে ৪৫ মিনিট পর অন্তত ১৫-২০ মিনিট রেস্ট নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ মো. আমিরুল আজাদ জানিয়েছেন, বর্তমানে খুলনা বিভাগের জেলাগুলোর পাশাপাশি দেশের আরও কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আগামী দু-একদিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে কোথাও কোথাও বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।