ঐতিহ্য
মামুন-উর-রশিদ সাজু
, যশোর
কার চেয়ে কে কত বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকবেন, কে হবেন এ বছরের ‘সেরা জামাই’! যুগের পর যুগ ধরে এই নিয়ে চলে এক মধুর অঘোষিত লড়াই!
বিজয়া দশমীর সকালে যশোরের মণিরামপুরে জমে ওঠে ঐতিহ্যবাহী ‘জামাই মেলা’। আর জামাইদের এই সম্মান রক্ষা বা অর্জনের লড়াইয়ে মাত্র একদিনেই বিক্রি হয়ে গেল দেড় কোটি টাকার মাছ!
১৯৫০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মেলা পারিবারিক বন্ধন ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। প্রতিবছর বিজয়া দশমীতে এই দিনটির জন্য মুখিয়ে থাকেন এলাকার হাজার জামাই। এবারের মেলায় পাঁচ থেকে ১৫ কেজি ওজনের রুই, কাতলা, চিতল, ব্ল্যাক কার্প, পাঙাশ ও সিলভার কার্প মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা।
খুলনা থেকে কবরী রায় আসেন ‘জামাই মেলা’ দেখতে। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর দিনের একটি উৎসব। এটা জামাই বাজার হিসেবে পরিচিত। এখানে অনেক বড় বড় মাছ পাওয়া যায়। জামাইরা এখান থেকে মাছ কিনে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যায়। আমরা সবাই একসাথে আসি, আর সাথে থাকেন দাদাবাবু। উনি বাজারের সব থেকে বড় মাছটা কেনেন। এতে খুব মজা হয়।’
মাছ ব্যবসায়ী পিকিং মল্লিক বলেন, ‘ঢাকুরিয়া বাজারের এই জামাই মেলা বহু বছরের ঐতিহ্য। মেলায় আমার ঘেরের চাষ মাছ নিয়ে আসছি। মোটামুটি ভালোই বিক্রি করছি। রুই মাছ আছে ১০ থেকে ১১ কেজি, কাতলা মাছ আছে ১৪ থেকে ১৫ কেজি, তেলাপিয়া আছে দুই থেকে আড়াই কেজি সাইজের, সিলভার কার্প আছে পাঁচ থেকে ছয় কেজি সাইজের। যে রুই মাছ সবথেকে বড় তার দাম দেড় হাজার টাকা করে কেজি।’
বয়োবৃদ্ধ অমল ঘোষ জীবনের বহু দশক ধরে এই মেলার সাক্ষী হয়ে আছেন। বললেন, ‘চোখের পলকে কত বছর পেরিয়ে গেল! ছোটবেলা থেকে এই মেলা দেখে আসছি। আজও যখন দেখি জামাইরা হাসিমুখে বড় বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়ির দিকে ছুটে চলেছে, তখন বুকটা ভরে যায়। এই মেলা তো আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের শেকড়।’
গাবখালী গ্রামের জামাই কিশোর রায় বলেন, ‘‘১৯ বছর আগে মণিরামপুরের জামাই হয়েছি। সেই থেকে প্রতিবছর ‘জামাই মেলায়’ আসা এক আনন্দ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সকালে মেলা থেকে ১০৫০ টাকা কেজি দরে ১১ কেজি ২০০ গ্রামের বিশাল একটি কাতল মাছটি কিনেছি। এই মাছ শুধু ওজনে ভারী নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে আমার ১৯ বছরের স্মৃতি, ভালোবাসা এবং শ্বশুরবাড়ির সাথে আত্মিক সম্পর্কের টান।”
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ আবু সাঈদ বলেন, ‘‘ঢাকুরিয়ার ‘জামাই মেলা’ আমাদের এলাকার গর্ব ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু মাছ কেনাবেচার মেলা নয়, বরং পারিবারিক বন্ধন, ভালোবাসা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য মিলনমেলা। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে আমাদের শেকড় ও আবেগ জড়িয়ে আছে। তাই এর সংরক্ষণ ও বিকাশে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে মেলার নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে এই লোকঐতিহ্যকে জাতীয় পর্যায়ে আরও পরিচিত করা সম্ভব।”
মেলা ও বাজারের সার্বিক প্রস্তুতি প্রসঙ্গে ঢাকুরিয়া বণিক সমিতির সভাপতি গাজী আব্দুল হান্নান বলেন, ‘১৯৫০ সাল থেকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জামাইদের এই সম্মান ও প্রতিযোগিতামূলক মাছ কেনার ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, আজকের এই দিনেও মেলার প্রতিটি কোণে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়বে। প্রায় দেড় কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়েছে বলে তিনি জানান।’
‘জামাই মেলায়’ এসেছিলেন মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সম্রাট হোসেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলার এই সুপ্রাচীন লোকসংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্য আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। জামাইদের মাছ কেনাকে কেন্দ্র করে ঢাকুরিয়ার এই মেলা যেভাবে পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং মেলায় আগত মানুষের নিরাপত্তা ও আনন্দ নিশ্চিত করতে প্রশাসন সবসময় পাশে রয়েছে।’