রাসেল মাহমুদ
, যশোর
যশোর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান অভয়নগর উপজেলা। এই উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামের ভৈরব নদের দক্ষিণ কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক অনন্য স্থাপত্যশিল্প-ইতিহাসে যা ‘এগারো শিব মন্দির’ নামে পরিচিত।
ঐতিহাসিক তথ্য মতে, প্রায় পৌনে তিনশ’ বছরের প্রাচীন এই মন্দিরগুচ্ছ কেবল বাংলার সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যের স্মারক নয়, বরং এর প্রতিটি ইটের খাঁজে লুকিয়ে রয়েছে এক রাজকন্যার করুণ বিয়োগান্তক ইতিহাস এবং একটি অঞ্চলের নামকরণের আখ্যান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাটানো প্রাপ্ত তথ্য সূত্রে থেকে জানা যায়, ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে চাঁচড়া রাজপরিবারের বংশধর জমিদার রাজা নীলকণ্ঠ রায় এই এলাকায় তার বাসস্থান ও রাজ্য পরিচালনা শুরু করেন। রাজা নীলকণ্ঠ রায়ের ‘অভয়া’ নামে এক রূপবতী কন্যা ছিলেন।
নড়াইলের জমিদারপুত্র নীলাম্বর রায়ের সঙ্গে ধুমধাম করে অভয়ার বিয়ে হয়। তবে বিয়ের কিছুদিন পরেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান নীলাম্বর রায়। অল্প বয়সেই বিধবা হন রাজকন্যা অভয়া।
স্বামীর অকালমৃত্যুর পর অভয়া পার্থিব সব সুখ বিসর্জন দিয়ে বাকি জীবন দেবাদিদেব শিবের আরাধনায় কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মেয়ের শোক লাঘব ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতে রাজা নীলকণ্ঠ রায় ভৈরব নদের তীরে এক সারিতে ১১টি দৃষ্টিনন্দন শিব মন্দির নির্মাণ করে দেন।
রাজকন্যা অভয়ার নামানুসারেই প্রথমে অঞ্চলটির নাম হয় ‘অভয়াপুর’ বা ‘অভয়াসাগর’, যা কালক্রমে আজকের ‘অভয়নগর’ এ রূপ নেয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, একটি উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে নির্মিত হয়েছে মন্দিরগুলো। মাঝখানে প্রধান এবং বড় শিব মন্দিরটি অবস্থিত, যার দু’পাশে রয়েছে আরও ৫টি করে মোট ১০টি তুলনামূলক ছোট মন্দির।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী আটচালা রীতির স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি এই মন্দিরগুলোর দেওয়ালে একসময় ছিল অসাধারণ টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কাজ। তৎকালীন মৃৎশিল্পীদের কারুকাজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো রামায়ণ-মহাভারতের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি।
কালের আবর্তে অনেক কারুকাজ ক্ষয়ে গেলেও মন্দিরগুলোর সুউচ্চ শিখর ও নির্মাণশৈলী এখনো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
দীর্ঘদিন অবহেলায় থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই মন্দিরগুচ্ছকে ‘সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রাচীন এই ঐতিহ্যের রূপ ও মূল কাঠামো ধরে রাখতে সীমিত পরিসরে সংস্কার কাজও করা হয়েছে। প্রতিদিন যশোর ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে ইতিহাসপ্রেমী ও সাধারণ পর্যটকরা এই মন্দিরে ঘুরতে আসেন।
স্থানীয়দের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সুগম করা এবং মন্দির প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হলে এটি যশোরের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
ইতিহাস, লোককথা আর অসাধারণ স্থাপত্যরীতির এই অপূর্ব মেলবন্ধন আজও ভৈরব নদের তীরে নীরবে সাক্ষী দিয়ে যাচ্ছে এক পিতা ও তার শোকাতুর রাজকন্যার ভালোবাসার গল্পের।