মানুষের মুখ
বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
ভাগ্য বদলের আশায় একসময় বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন লাল মিয়া (৫৪)। কয়েকদফা চেষ্টা করেও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। দালালদের খপ্পরে পড়ে হারিয়েছেন জীবনের সঞ্চয়, বিক্রি করতে হয়েছে জমিজমা ও বসতভিটা। কিন্তু জীবনের কাছে হার মানেননি তিনি। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই ৩২ বছর ধরে বাইসাইকেলে ডিমের ব্যবসা করে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন।
মাগুরার শালিখা উপজেলার ছোট আমিয়ান গ্রামের বাসিন্দা লাল মিয়ার জীবন এক সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও দুবাই যাওয়ার আশায় ২০০২ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে চারদফায় দালালদের হাতে তুলে দেন প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা। বিদেশে যাওয়ার তার সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। বরং একে একে বিক্রি করতে হয়েছে চার বিঘা আবাদি জমি এবং সাড়ে ১২ শতক বসতভিটা। আজ তিনি বসবাস করছেন অন্যের জমিতে।
ভাগ্য তার সঙ্গে নির্মম পরিহাস করলেও মনোবল ভাঙতে পারেনি। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ভোরে পুরনো সাইকেলটি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। মাগুরার শালিখা ও যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামে ঘুরে ঘুরে হাঁস ও মুরগির ডিম সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করেন।
সপ্তাহজুড়েই লাল মিয়ার ব্যস্ততা। সপ্তাহে তিনদিন গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে ডিম সংগ্রহ করেন, আর তিনদিন যায় বাজারজাতকরণে। একদিন বিশ্রাম।
প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে কমপক্ষে ৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয় তাকে। বয়সের অঙ্ক বাড়লেও কমেনি তার কর্মস্পৃহা। রোদ, বৃষ্টি কিংবা শীত—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারে না। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এখনও একই উদ্যমে ছুটে চলেছেন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, লাল মিয়া শুধু একজন ডিম ব্যবসায়ী নন, তিনি সংগ্রাম ও অধ্যবসায়ের এক জীবন্ত উদাহরণ। জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েও তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং কঠোর পরিশ্রম আর সততাকে পুঁজি করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
লাল মিয়ার গল্প শুধু একজন মানুষের নয়; এটি হাজারো স্বপ্নভঙ্গের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, শ্রমের মর্যাদা ও অদম্য জীবনীশক্তির গল্প।