যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ভাইরাসে মরছে চিংড়ি

জিয়াউস সাদাত

, খুলনা

প্রকাশ : বুধবার, ২৬ আগস্ট,২০২৬, ১০:০০ এ এম
ভাইরাসে মরছে চিংড়ি

ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার দক্ষিণ শৈলমারি ও খলশিবুনিয়া গ্রামের অসংখ্য মাছের খামার। নদী-খালবেষ্টিত এ জনপদের দুই শতাধিক খামারে সেমি ইনসেনটিভ চিংড়ি চাষই এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময় একের পর এক খামারে পোনাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে লাখ লাখ মাছ মারা যাচ্ছে। গত এক থেকে দেড় মাসের ব্যবধানে অর্ধ কোটি টাকারও বেশি মাছ মারা গেছে। এতে করে খামারিরা চরম দুশ্চিন্তা ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

মৎস্য খামারিদের অভিযোগ, স্পেসিফিক প্যাথজেন ফ্রি বা জীবাণুমুক্ত পোনার ঘোষণা দিয়ে দেশবাংলা হ্যাচারি এবং ফিসটেক হ্যাচারি থেকে তাদের জীবাণুযুক্ত পোনা সরবরাহ করা হয়। পোনা ছাড়ার পর নির্দিষ্ট কয়েকদিন যেতে না যেতেই ‘হোয়াইট স্পট ডিজিজ’ এবং ‘আর্লি মটালিটি ডিজিজ’ নামে রোগে আক্রান্ত হয়ে মরে যাচ্ছে পোনাগুলো। চোখের সামনেই একের পর এক পুকুরের মাছ মরে যাওয়া দেখতে হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। এজন্য সরকারের মাধ্যমে মৎস্য খামারিরা উল্লিখিত দুটি হ্যাচারিকে জবাবদিহির আওতায় এনে তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সম্প্রতি দক্ষিণ শৈলমারি ও খুলশিবুনিয়া গ্রামে গেলে চাষিরা এভাবেই তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

স্থানীয় চিংড়ি চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের একমাত্র পরিকল্পিত সেমি ইনসেনটিভ চিংড়ি চাষ এলাকা খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ শৈলমারী ও খলশিবুনিয়া গ্রাম। এই দুই গ্রা প্রায় প্রতিটি পরিবারই চিংড়ি চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

প্রতি বছরের মতো এবারও এখানকার দুই শতাধিক সেমি ইনসেনটিভ খামারে চিংড়ি চাষ শুরু করেন খামারিরা। যথারীতি দেশ বাংলা হ্যাচারি এবং ফিসটেক হ্যাচারি থেকে প্রতি হাজার পোনা দেড় হাজার টাকা দরে কিনে তাদের পুকুরগুলোতে ছাড়া হয়। কিন্তু পোনাগুলো ‘হোয়াইট স্পট ডিজিজ’ এবং ‘আর্লি মটালিটি ডিজিজ’ নামক রোগে আক্রান্ত হয়। যার ধারাবাহিকতায় জুলাই মাসের প্রথম দিক থেকেই চিংড়ি মারা যাওয়া শুরু হয়। ইতিমধ্যেই মাছ মরে যাওয়ায় অর্ধ শতাধিক চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

রাখি মৎস্য খামারের মালিক লিপটন মন্ডলের প্রায় ৯০ হাজার পোনা মারা গেছে। সুতনু গ্রো ফার্মের মালিক সুতনু গাইনেরও চারটি পুকুরে প্রায় ৭০ হাজার পোনা মারা গেছে। এসব পোনা ক্রয় করা হয়েছিল দেশবাংলা হ্যাচারি থেকে। একইভাবে শুভঙ্কর মন্ডলের লক্ষাধিক পোনা এবং কৃপা গাইনেরও লক্ষাধিক পোনা মারা যায়। এসব পোনা ফিসটেক হ্যাচারি থেকে ক্রয় করা হয়। খামারি কৃপা গাইন ফিসটেক হ্যাচারির একজন ডিলার।

একইভাবে বিদ্যুৎ কবিরাজের ৭০ হাজার, অমরেশ মন্ডলের ২০ হাজার, লিটুর ২০ হাজার, অসীম গাইনের ২০ হাজার, বিপ্রদাস বৈরাগীর ৫০ হাজার, গৌতম হালদারের ৫০ হাজার, হরেন্দ্রনাথের ৪০ হাজার, সরকারি চাকরিজীবী বাসুদেব মন্ডলের লক্ষাধিক, প্রফুল্ল কুমার রায়ের চার লক্ষাধিক, মৃন্ময় গোলদারের ৪০ হাজার, দুলালের ৩০ হাজার, অতনু গাইনের ৬০ হাজার, অমল গাইনের ৫০ হাজার, মহানন্দ গাহিনীর ৫০ হাজার, রিপন ঢালীর ২০ হাজার, সুকান্ত গাইনের ৫০ হাজার, মানষ মন্ডলের এক লাখ, তাপস মন্ডলের এক লাখ, নারী চাষী বিপুলা রায়ের ১০ হাজার এবং দেবাশীষ মন্ডলের ৪০ হাজার পোনা মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এর বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক মৎস্য খামারি এবং চাষি রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

খামারি গৌতম গোলদার বলেন, ‘আমি ফিসটেক কোম্পানির পোনা ছেড়েছিলাম। ৪৭ দিনের মাথায় হোয়াইট স্পট রোগ ছড়িয়ে পড়ায় সব মাছ মারা যায়। এলাকার প্রায় সব ঘেরেই একই সমস্যা।’

খামারি বিদ্যুৎ কবিরাজ জানান, তার পুকুরে দেশ বাংলা হ্যাচারির ৭০ হাজার পোনা ছেড়েছিলেন। কিন্তু ৬৪ দিনের মাথায় হোয়াইট স্পট রোগে সব মাছ মারা যায়।
নারী চাষি বিপুলা রায় বলেন, ‘আমি দশ হাজার পোনা ছাড়ি; যা ৩৫ দিনের মধ্যে মারা যায়’

লিপটন মন্ডল বলেন, ‘আমার মৎস্য খামারে দেশ বাংলা হ্যাচারির ৬০ হাজার এবং ফিসটেক হ্যাচারির ৩০ হাজার পোনা ছেড়েছিলাম। ৮২ ও ৪২ দিনের মাথায় সব মাছ মারা যায়।’

বিপ্রদাশ বৈরাগী বলেন, ‘প্রায় ৫০ হাজার মাছের পোনা ছেড়েছি। কিন্তু ৪৭ দিনের মাথায় সাদা দাগ রোগে আক্রান্ত হয়ে সমস্ত মাছ মারা যায়।’
খামারি বাবলু মন্ডল বলেন, ‘হ্যাচারির দুর্নীতি ও নিম্নমানের পোনার কারণে আমরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। সরকারের কাছে গুণগত মানসম্পন্ন পিএল ও পোনা সরবরাহের জোর দাবি জানাই।’

ফিশ ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ফোয়াব) পক্ষ থেকে সরেজমিনে খামারগুলো পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে।

ফোয়াবের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান শাহিন বলেন, ২০১২ সাল থেকে এখানে প্রায় দুই শতাধিক মানুষের চাষাবাদের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সারাদেশে যেখানে হেক্টর প্রতি ৩৫০ কেজি উৎপাদন হয়, সেখানে এই এলাকার চিংড়ি চাষিরা হেক্টর প্রতি ৮-৯ হাজার কেজি চিংড়ি উৎপাদন করে। নিজের কর্মসংস্থান, দেশের অর্থনীতি এবং বৈদেশিক অর্থনীতিতে দেশকে সমৃদ্ধ করার জন্য তারা নিরলসভাবে দিনরাত, ঝড়-বৃষ্টিতে কাজ করছেন।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে ফোয়াব সভাপতি বলেন, “ইতিমধ্যে সরকার চিংড়ি সেক্টরে দুইশ’ কোটি টাকা দিয়েছে। কিন্তু চাষিরা সে টাকা পায়নি। আমরা দেখছি এখানে শুভঙ্করের ফাঁকি।”

চিংড়ি পোনায় টুকটাক সমস্যা হতে পারে স্বীকার করে দেশবাংলা হ্যাচারির মালিক এমএ হাসান পান্না বলেন, এক মাস বয়সের মধ্যে পোনা মারা গেলে তার দায় হ্যাচারির। কিন্তু এসব পোনা দুই-তিন মাস পর মারা গেছে। এর দায় ফার্মারদের।

তার হ্যাচারিতে কোনো ভাইরাস নেই দাবি করে তিনি বলেন, রোগমুক্ত হ্যাচারির পোনাও রোগমুক্ত খামারে ব্যবহার করতে হবে।

ফিসটেক হ্যাচারির মালিক তারেক সরকার বলেন, ঘের বা পুকুরের বায়োসিকিউরিটি মেইনটেন করতে না পারলে সমস্যা হবেই। তিনিও তার প্রতিষ্ঠানের পোনায় কোনো সমস্যা হয়নি বলে দাবি করে বলেন, পরিবেশগত সমস্যার কারণে পোনা মারা যেতে পারে। তবে, এর কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান শৈলমারি ও খলশিবুনিয়ায় চিংড়ি মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের কাছ থেকে স্যাম্পল কালেকশন করে ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় ইনফেকশাস হাইপোডার্মাল অ্যান্ড হেমাটোপয়েটিক নেক্রোসিস নামক ভাইরাস পাওয়া গেছে। তবে, হোয়াইট স্পট ডিজিজ এবং আর্লি মটালিটি ডিজিজ নামক রোগও দেখা গেছে। এ কারণে খামারিদের বিশেষ মিনারেল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মৎস্য অফিস খামারিদের সার্বিক পরামর্শ দিচ্ছে।

তিনি বলেন, ভাইরাস হ্যাচারি থেকেও হতে পারে। আবার ফিড, পানি, কাঁকড়া, কুচিয়া, পাখি এবং মানুষসহ পরিবেশ থেকেও হতে পারে। এ কারণে এ ভাইরাস যে শুধুমাত্র হ্যাচারি থেকে আসছে- এটি বলা কঠিন।

গত বছর ল্যাবে পরীক্ষার পর দেশবাংলা হ্যাচারির পোনায় জীবাণু শনাক্ত হওয়ায় ৪০ থেকে ৪২ লাখ পোনা নষ্ট করা হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)