সম্পাদকীয়
যশোরে সিসিইউ’র জন্য ৩৩ পদ সৃজন
হৃদরোগ এখন দেশের মানুষের জন্য অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা দেখা দিলে দ্রুততম সময়ে নিবিড় চিকিৎসা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান গড়ে দেয়। অথচ যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) অভাবে সংকটে রয়েছেন। জরুরি অবস্থায় রোগীকে ঢাকা বা খুলনা নেওয়ার পথে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। এতে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর সংখ্যাও অগুনতি।
এই বাস্তবতায় যশোর জেনারেল হাসপাতালে ২৮ শয্যার স্বতন্ত্র সিসিইউ পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার খবর নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। ইউনিটটির জন্য রাজস্ব খাতে ৩৩টি পদ সৃজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। দীর্ঘদিন ধরে কার্যত পড়ে থাকা একটি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবার বাস্তব সেবাকেন্দ্রে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে পদ সৃজনের অনুমোদনই শেষ কথা নয়। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত অতিক্রম করে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত করা। অর্থ বিভাগের সম্মতি, বেতন স্কেল ভেটিং, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ, ক্যাডার পদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বিধিমালা সংশোধন- এসব প্রক্রিয়া যেন অযথা দীর্ঘসূত্রতার কারণ না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
একই সঙ্গে সিসিইউ পরিচালনার জন্য শুধু সংখ্যাগতভাবে জনবল নিয়োগ করলেই হবে না; দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট এবং সহায়ক কর্মীদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর টিম গড়ে তুলতে হবে। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ এবং ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সিসিইউ চালু করে তা যদি পর্যাপ্ত জনবল বা যন্ত্রপাতির অভাবে কার্যত অচল থাকে, তবে আগের মতোই মানুষকে হতাশ করবে।
বিশেষ করে হৃদরোগের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন রোগীকে যশোর থেকে ঢাকায় পাঠানোর আগে স্থানীয়ভাবে জরুরি চিকিৎসা ও স্থিতিশীল করার ব্যবস্থা থাকলে বহু জীবন রক্ষা করা সম্ভব। ফলে এই সিসিইউ শুধু যশোর শহরের মানুষের জন্য নয়; বৃহত্তর যশোর অঞ্চল এবং আশপাশের জেলার মানুষের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে।
এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যশোর সদর আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যে গতিতে কাজটি এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সেই গতিতেই এগোতে হবে। আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচের মাধ্যমে সময়ক্ষেপণের যে অভিযোগ এই দেশে বহুদিন ধরে রয়েছে, চিকিৎসা খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটিকে যেন তা ছুঁতে না পারে, সেদিকে সবাইকে নজর রাখতে হবে।
জনগণের স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক বিষয়ে দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। অতীতে যে কারণে প্রকল্পটির কার্যক্রম থেমে গিয়েছিল, ভবিষ্যতে যেন কোনো প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এর কার্যক্রম ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের মধ্যেই সিসিইউ চালুর আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। আমরা আশা করবো, এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
একইসঙ্গে আমরা একথাও বলতে চাই, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের উদ্যোগে স্থাপিত করোনারি কেয়ার ইউনিটটি যাদের কারণে কার্যত অব্যবহৃত হয়ে পড়ে ছিল এবং কোটি কোটি টাকার মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে, একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এই কাজটি করলে নতুন করে চালু হতে যাওয়া করোনারি কেয়ার ইউনিট ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত বন্ধ হওয়ার আশঙ্কামুক্ত থাকবে।