স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
যশোরের চাঁচড়ায় অবস্থিত দশমহাবিদ্যা মন্দিরের ইসকন ‘সাধুদের’ অনৈতিক জীবনযাপন, মাদক কারবার, উপাসনালয়ে অর্থবাণিজ্য, স্থানীয় সেবায়েতদের মন্দির থেকে তাড়িয়ে দেওয়াসহ আরও অভিযোগ সামনে আসছে। স্থানীয়রা বলছেন, ধর্মকে ব্যবহার করে ব্যবসা করছে ইসকন।
ধর্মের নামে ব্যবসা ও ভক্তদের সাথে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের অভিযোগ
স্থানীয় সাধারণ সনাতনিদের অভিযোগ, মন্দিরের পবিত্র স্থানের ওপর শৌচাগার নির্মাণ করেছে ইসকন। একই সাথে বহুকাল ধরে সেবা দিয়ে আসা স্থানীয় পরিবারগুলোকে ‘অশুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে মূল কালীমন্দিরে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মন্দিরে বিগ্রহ স্নান, জল ঢালা কিংবা প্রসাদ পাওয়ার জন্য ভক্তদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা হচ্ছে।
টাকা দিতে না পারলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও জল না ঢেলে শূন্য হাতে ফিরে যেতে হয় ভক্তদের। এমনকি দক্ষিণার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ভক্তদের ‘গোল্ড’, ‘ডায়মন্ড’ বা ‘প্ল্যাটিনাম’ ক্যাটাগরিতে ভাগ করে বৈষম্য সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে স্থানীয় এক নারী বলেন, মন্দিরে প্রসাদ বিতরণ থেকে শুরু করে বিশেষ তিথিতে বিগ্রহ স্নানের মতো সাধারণ আচারেও বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। নামমাত্র মূল্যের কলস ও জল ঢালার অনুমতির জন্য মোটা দক্ষিণা নেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে সাধারণ ভক্তদের লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেতে হয়। এছাড়া ভক্তদের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে আলাদা সুবিধা দেওয়া হয়।
স্থানীয় ব্রাহ্মণ পরিবারের সদস্যরা জানান, ধর্মীয় ঐতিহ্য বজায় রাখা এবং সেবা করার উদ্দেশ্যে তারা একসময় ইসকন অনুসারীদের সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তাদের অশালীন আচরণ, বাধা-নিষেধ এবং দখলদারত্বের কারণে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হয়ে অনেক পুণ্যার্থী ও সেবায়েত পরিবারের সদস্যরা মন্দিরে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন।
স্থানীয় যুবক অর্ঘ্য দত্ত বিজয়ের অভিযোগ, দুর্গাপূজা বা কালীপূজার সময় বাইরের অতিথিরা মন্দিরে এলে ইসকন সদস্যরা তাদের সাথে উচ্ছৃঙ্খল ও কুরুচিপূর্ণ ব্যবহার করেন। এছাড়া মন্দিরের উন্নয়নের নামে ভক্তদের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকা ইসকন সদস্যরা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন।
বাধ্যতামূলক টাকা আদায় ও ধর্মাচারের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ধর্মীয় বিধান ও নৈতিক ভিত্তি নিয়ে কথা হয় যশোর শহরের বেজপাড়া সর্বজনীন পূজা মন্দিরের সহকারী পুরোহিত শুভ কুমার চক্রবর্তীর সাথে। বিগ্রহ স্নান বা পূজা দেওয়ার নামে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দাবি করা ও চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি হিন্দু ধর্মীয় রীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে মত দেন তিনি।
‘‘উপাসনালয়ে আসা ব্যক্তির নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা উচিত। কারও দশ টাকা দেওয়ার সামর্থ্য থাকলে সে দেবে, দুই টাকা থাকলে দেবে, আর যার একদম নেই, সে নিঃস্বার্থভাবে বলবে, ‘আমার সামর্থ্য নেই’। কিন্তু টাকা দিতে না পারার কারণে কারও পূজা আটকে থাকবে না, কারও ভক্তি আটকে থাকবে না। পূজা ও ভক্তি সম্পূর্ণ ব্যক্তি স্বাধীনতার বিষয়। সামর্থ্য না থাকলেও মন্দিরে পূজা দিতে কোনো বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই,’’ বলছিলেন শুভ কুমার চক্রবর্তী।
তবে প্রত্যেক মন্দিরেই প্রতি মাসে বেশ কিছু নির্দিষ্ট খরচ থাকে। অনেক সময় বিয়ে, জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকীর মতো আয়োজনের ক্ষেত্রে মন্দির কমিটি হয়তো উন্নয়নের জন্য একটা ন্যূনতম অ্যামাউন্ট ধার্য করে, যা মন্দিরের কাজেই লাগে। তবে কেউ তা দিতে অপারগ হলে আলাপ-আলোচনা করে স্বাভাবিকভাবেই পূজা করা সম্ভব, সেখানে জোরজবরদস্তির কোনো স্থান নেই বলে পরিষ্কার জানান এই পুরোহিত।
নারীসঙ্গের অভিযোগ
ইসকন ‘সাধু’ ও তাদের সহযোগীদের কথিত অনৈতিক জীবনযাপন নিয়েও নানা কথা প্রচলিত আছে চাঁচড়া ও সংলগ্ন এলাকায়। চাঁচড়া বর্মণপাড়ায় বসবাসকারী প্রায় ৩৫ বছর বয়সী এক নারীর বাসায় দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসকন ‘সাধুদের’ দিনের পর দিন অবস্থানের অভিযোগও রয়েছে।
ইসকনের ‘সাধুরা’ নিজেদের ব্রহ্মচারী হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। ব্রহ্মচারীদের নারীসঙ্গে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু আলোচিত ওই নারীর একটি মাত্র ঘরের বাসায় ‘সাধুদের’ আসা-যাওয়া ও রাতযাপন ‘শুধু অনৈতিকই নয়, ধর্মীয় রীতিনীতিপরিপন্থি’ বলছেন স্থানীয়রা।
ইসকনের ‘সাধুদের’ প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে ওই এলাকার এক যুবক বলেন, ‘তাদের আচার-ব্যবহার ও কথাবার্তা উগ্র। তারা নিজেদের মতকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে অন্যান্য চিন্তাধারাকে তুচ্ছজ্ঞান করে। এমনকি জনসম্মুখে ধর্মীয় আলোচনায় বসে অন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখায় না, অহংকারী আচরণ করে। এসব বেয়াদবি ও উগ্র স্বভাবের কারণে স্থানীয় প্রকৃত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ইসকনমুখী হওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।’
স্থানীয় আরেক গৃহবধূ জানান, যে নারীর বাসায় ইসকন সাধুদের যাতায়াত নিয়ে বিতর্ক, সেই নারী ইতিপূর্বে বর্মণপাড়ার চৈতন্য নামে এক ব্যক্তি এবং পরবর্তীতে আরেক বয়োজ্যেষ্ঠকেসহ একাধিক বিয়ে করেছেন। তিনি ইচ্ছা অনুযায়ী কখনও শাঁখা-সিঁদুর পরেন, আবার কখনও খুলে ফেলেন। সম্প্রতি এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে ওই নারী জবাব দেন, ‘প্রভুদের’ সাথে চলতে গেলে শাঁখা-সিঁদুর না পরলে মানায় না।
তবে সুবর্ণভূমির কাছে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলোচিত ওই নারী। তার দাবি, ২০২১ সাল থেকে তিনি ইসকনের সাথে যুক্ত থেকে নিরামিষ রান্নাবান্নার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার দাবি, ইসকনের কোনো প্রধান প্রভু বা শীর্ষ সাধু তার ঘরে এসে থাকেননি। কেবল তার গৃহত্যাগী প্রবীণ দীক্ষাগুরু (ব্রহ্মচারী) তিন দিন এবং এক বয়োবৃদ্ধ পূজারী বাবা কিছুদিন সেখানে থেকে সেবা-পূজা দিয়েছেন, যারা ইসকনের আওতাভুক্ত নন।
মাদক কারবারের অভিযোগ
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা দিলীপ কুমার দত্ত মন্দিরে বিরাজমান পরিস্থিতি ও ইসকন অনুসারীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এই মন্দির থেকে তরুণদের কাছে গাঁজা বিক্রি করা হয়! স্থানীয় ছেলেরা আমার কাছে মন্দির থেকে কেনা গাঁজা নিয়ে এসে দেখিয়ে বলছে, ‘আপনাদের মন্দিরের লোকজনের কাছ থেকে গাঁজা কিনে আনলাম।’’
ইসকন অনুসারীদের পরিচয় ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দিলীপ কুমার দত্ত। তিনি বলেন, ‘এখানে যারা নতুন এসেছে, আমি তাদের কাছে পরিচয়পত্র দেখতে চেয়েছিলাম। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমরা কি সত্যি সত্যিই ইসকনের লোক, নাকি অন্য কিছু? তোমাদের পরিচয়পত্র দেখাও! কিন্তু তারা একটা পরিচয়পত্রও দেখাতে পারেনি। এদের বেশিরভাগই প্রতারক ও বাটপার। এদের দ্বারা যেকোনো অনৈতিক কাজ করা সম্ভব।’
তিনি আরও জানান, আগে দশমহাবিদ্যা মন্দিরের অভ্যন্তরে ঐতিহ্যবাহী কালী মন্দির ও শিব মন্দিরসহ একাধিক উপাসনালয় ছিল। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় বাসিন্দারা বহুকাল ধরে হারিকেন ও প্রদীপ জ্বালিয়ে ভক্তিভরে পূজা-অর্চনা করেন। ২০১৬ সালের দিকে কমিটি ও স্থানীয়দের বুঝিয়ে ইসকনের লোকজনকে মন্দিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয়। চুক্তি ছিল ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা ও কালীপূজা যথারীতি চলবে এবং পাশে ইসকনের কার্যক্রম থাকবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরো মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নেয় ইসকন অনুসারীরা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসকনের পক্ষ থেকে চেষ্টা করেও কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ইসকনের যশোর জেলা শাখার সভাপতিকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
চাঁচড়া দশমহাবিদ্যা মন্দিরে বর্তমানে অবস্থান করা ‘সাধুরাও’ বিষয়টি এড়িয়ে যান। তারা জানান, এখানে নতুন এসেছেন, এসব বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না।