সম্পাদকীয়
যশোর শহরের হাজি মুহম্মদ মহসিন (এইচএমএম) রোডে শুক্রবারের ফুটপাতের বাজার শহুরে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা। সপ্তাহের অন্য দিন যে ফুটপাত ও রাস্তা পথচারী ও যানবাহনের চলাচলে ব্যস্ত থাকে, শুক্রবার সেখানে বসে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পসরা। জুতা, পোশাক, শাড়ি, থ্রিপিস থেকে শুরু করে বই-খাতা, মশারি, পর্দা, প্রসাধনীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য পাওয়া যায় এখানে। ক্রেতাদের উপস্থিতি এবং বিক্রেতাদের দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে, এই বাজারের একটি স্থায়ী সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এই বাজারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কম মূল্য ও দরদামের সুযোগ। বড় মার্কেটের নির্ধারিত দামের তুলনায় এখানে ক্রেতারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ পান। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এই নমনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সবার জন্য পোশাক বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে সামান্য মূল্য পার্থক্যও অনেক সময় বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ফুটপাতের বাজারকে শুধু ‘সস্তার বাজার’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি একদিকে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করছে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার সুযোগ করে দিচ্ছে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এই বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন কয়েক ডজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাদের অনেকেই সপ্তাহের বিভিন্ন দিন বিভিন্ন স্থানে বসেন এবং শুক্রবার এইচএমএম রোডে আসেন। কারও ১৬ বছরের সম্পর্ক এই বাজারের সঙ্গে। কারও সন্তানও একই পেশায় যুক্ত। অর্থাৎ এটি কেবল সাময়িক ব্যবসার ক্ষেত্র নয়; বহু পরিবারের আয়ের ধারাবাহিকতার একটি অংশ। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে নগর ব্যবস্থাপনার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার প্রভাব পড়বে সরাসরি মানুষের জীবিকায়।
তবে এর বিপরীত দিকও রয়েছে। ফুটপাত মূলত পথচারীদের চলাচলের জন্য। সেখানে বাজার বসলে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যানজট বাড়তে পারে এবং নগরের শৃঙ্খলাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার প্রয়োজন এবং নগরবাসীর চলাচলের অধিকার—দুটিকে মুখোমুখি দাঁড় করানো সমাধান হতে পারে না। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও মানবিক ব্যবস্থাপনা।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ চাইলে নির্দিষ্ট দিন ও নির্দিষ্ট অংশে পরিকল্পিতভাবে বাজার পরিচালনার উদ্যোগ নিতে পারে। পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রেখে অস্থায়ী দোকানের নির্ধারিত স্থান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। খাজনার পরিমাণ ও নিয়ম প্রকাশ্য করা হলে ব্যবসায়ী ও কর্তৃপক্ষ—উভয়ের জন্যই জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও জরুরি চলাচলের বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।
যশোরে শুক্রবারের ফুটপাতের বাজার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নগরের অর্থনীতি শুধু বড় বিপণিবিতান বা অভিজাত মার্কেটকে ঘিরে গড়ে ওঠে না। ছোট বিক্রেতা, সীমিত আয়ের ক্রেতা এবং অল্প পুঁজির ব্যবসাও নগর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই বাজারকে উচ্ছেদ করা কিংবা সম্পূর্ণ উপেক্ষা—কোনোটিই টেকসই সমাধান নয়। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থাপনা, যেখানে পথচারীর অধিকার, নগরের শৃঙ্খলা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা—তিনটির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হবে। তাহলেই শুক্রবারের এই বাজার শুধু টিকে থাকবে না, বরং আরও সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব রূপ পেতে পারে।