তারেক মাহমুদ
, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে বিতাড়িত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হওয়ার খবরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বেলা ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ‘বঙ্গবন্ধু মঞ্চ’ নামে একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে। বিষয়টি সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এমন কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সংবাদের বিষয়ে তারা এখনও নিশ্চিত নন।
টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। এতে অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করা একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন সুবর্ণভূমি প্রতিবেদক। তারা বলছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির প্রধান ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনা বৈঠকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তারা কেউ পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
বৈঠকে অংশ নেওয়া এক যুবলীগ নেতা বলেন, শেখ হাসিনা তৃণমূল পর্যায়ে দলকে সংগঠিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে বর্তমান সরকারের সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিপর্যয় এবং সার সংকটের বিষয়গুলো গ্রামে গ্রামে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে জোর প্রচারণার তাগিদ দিয়েছেন।
বৈঠকে কালীগঞ্জ উপজেলার ১১ ইউনিয়ন ছাড়াও ঝিনাইদহ সদরের নলডাঙ্গা, ঘোড়শাল, মহারাজপুর ও ফুরসন্ধি ইউনিয়নসহ মোট ১৫ ইউনিয়ন এবং কালীগঞ্জ শহরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। প্রতি ইউনিয়নের দুই থেকে তিনজন কথা বলার সুযোগ পান বলেও উল্লেখ করেন তারা।
বৈঠকের শুরুতেই কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব হোসেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে কালীগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতির পদটি খালি বলে অবহিত করেন। এসময় শেখ হাসিনা দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাবেক এমপি প্রয়াত আব্দুল মান্নানের স্ত্রী শামীম আরা মান্নানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তখনকার এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতে খুন হলে পদটি শূন্য হয়।
বৈঠকে অংশ নেওয়া ছাত্রলীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শেখ হাসিনা তৃণমূল পর্যায়ে দলকে সংগঠিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে, তিন ঘণ্টার অধিক সময় অনুষ্ঠিত টেলিগ্রাম গ্রুপের ওই অনলাইন বৈঠকে কতজন কথা বলেছেন নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও প্রায় ৪০ জনের অধিক নেতা কথা বলেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট রিগান ও মোস্তাক আহম্মেদ লাভলুসহ একাধিক ব্যক্তি নিজেদের ফেসবুক আইডি থেকে বৈঠকের বিষয় নিয়ে পোস্ট করলে মুহূর্তে তা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
বৈঠকের পর এক কর্মী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গত কালকের নেত্রীর মিটিং এ একটা কথা খুব অন্তরে প্রশান্তি ঝড় তুলেছে প্রিয় রাজু আহম্মেদ রনি চেয়ারম্যান। শেখ হাসিনার সাথে ভার্চুয়াল ওই বৈঠকে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রাজু আহম্মেদ রনি ভাই বলেছে, নেত্রী আমাদের নেতা জনতার নেতা জননেতা জনাব আনোয়ারুল আজীম আনার এমপি মহাদয় ১০ হাজারের অধিক জানাযায় শরিক হয়েছে কিন্তু তার জানাযাটা হয়নি। নেত্রী যদি আমাদের নেতা বেচে থাকে তাহলে নেত্রী আমাদের নেতাকে আপনি আপনার সাথে করে আনবেন। আর যদি মারা যেয়ে থাকেন আপনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে প্রমাণ করবেন আমাদের নেতা মারা গেছে এবং খুনিদের আপনি সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।’
মুস্তাক আহম্মেদ লাভলু ফেসবুকে লেখেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজের মুখে আব্দুল মান্নান সাহেবের স্ত্রী কে দায়িত্ব প্রাপ্ত সভাপতি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আসুন কৌশল অবলম্বন না করে এক কেন্দ্রীক না হয়ে একসাথে মিলিত হই।’
কথিত বৈঠকের বিষয়টি নিয়ে যারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, তারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পলাতক জীবনযাপন করছেন।
এই বিষয়ে আরও জানতে কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া শামীম আরা মান্নানের ব্যক্তিগত ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে বিকল্প মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদকের সাথে অনলাইন বৈঠকের বিষয়ে কথা বলতে অপরগতা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার ওসি জুলফিকার আলী জানান, শেখ হাসিনার মিটিং করেছেন বলে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছেন। তবে, আদৌ মিটিংটি হয়েছে কি-না জানা যায়নি। পুলিশ এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছে।
শেখ হাসিনার অনলাইন বৈঠকের বিষয়ে ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিঞা মোহাম্মদ আশিস বিন্ হাছানের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তবে, এ বিষয়ে ঝিনাইদহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ বিল্লাল হোসেন ফোনে বলেন, ‘মিটিং হয়েছে- এমন সংবাদ কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছে, যা আমাদের নজরে এসেছে। তবে বস্তুনিষ্ঠ কোনো তথ্য এখনও আমরা পাইনি। এ বিষয়ে আমাদের সাইবার ক্রাইম টিম কাজ করছে।’