সমাজবীক্ষণ
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
গরুকে আমার ভীষণ হিংসে হয়। কারণ গরু মহাশয় আরামসে অর্ধশয়ন করে জাবর কাটতে কাটতে বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধিতে কত যে বড় মাপের অবদান রেখেছে, তা হিসাব করে নিজেকে নিতান্ত ‘গোবেচারা’ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারি না।
অথচ গরু স্কুল-কলেজের সিঁড়ি না ভেঙেই বাংলা ভাষাকে ‘গোবেচারা’ নামের কান লাল করা বিশেষণটি উপহার দিতে পেরেছে। আমাকে যখন ‘গোমূর্খ’ বলা হয়, তখন কিন্তু গরুর স্ট্যাটাস আমার ওপরেই থাকে!
রাত দেড়টায় পেটে ছুঁচোর দুরন্ত দাপাদাপি শুরুর পর অফিস থেকে বাসায় ফিরে ডাইনিংয়ে বসে যখন ‘গোগ্রাসে’ গিলি, তখনও গরু আমাকে হাম্বা রবে তার ঋণের কথা মনে করিয়ে দেয়।
শুধু কি তাই, পরম পূজনীয় আব্বাজান যখন সখেদে বলতেন, ‘তুই ব্যাটা একটা আস্ত গরু’, তখন থেকেই গরুকে হিংসে না করে আমার উপায় ছিল না। বিস্মিত হয়ে ভাবতাম ঠিকই তো, এই চার পা-ওয়ালা জন্তুটি বাংলা ভাষায় যত শব্দ, উপমা আর প্রবাদ বাক্য উপহার দিয়েছে, তার তুলনায় আমি যে নস্যি!
মনে আছে, এ গরুর ক্ষুরকে মস্তকে ধারণ করেই বিষাক্ত গোখরা (গোক্ষুরা) সাপও জাতে উঠেছে। শুধু সাপ কেন মুখ কিছুটা গরুর মতো বলেই কুমির সভ্য হতে ‘গোমুখ’ ধারণ করে বসে আছে। কুমিরের আরেক নাম কিন্তু গোমুখ। নদীও পিছিয়ে নেই। গরুর লেজ ধরে ধন্য হতে নদী ‘গোমতী’ নাম ধারণ করেছে।
গরুর স্বচ্ছ, ঢাউস আর নিষ্পাপ চোখের মর্যাদা দিতে মানুষ জানালার নাম রেখেছে ‘গবাক্ষ’। ‘গোত্র’ শব্দের মাঝেও রয়েছে গরুবন্দনা। কারণ গোত্র অর্থ গোষ্ঠ বা গোধনে নির্ভরশীল। আবার গোধূলি নিয়ে বাংলা ভাষায় কবিকুল যেভাবে বন্দনায় মেতেছেন, তা আমার মতো অনেক দ্বিপদ গরুর মর্মজ্বালার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্ঞানীজনরা বহু আগেই বলে গেছেন, ‘গরু, জরু ধান রাখ বিদ্যমান’। গরু আর জরুকে (স্ত্রী) একই সোশ্যাল স্ট্যাটাস তো তারাই দিয়ে গেছেন।
গরুকে নিয়ে জ্ঞানী মূর্খদের একটাই অপবাদ। আর তা হচ্ছে ‘গরু তো গরুই’। সো হোয়াট? চাঁদেরও কলঙ্ক থাকে।
বাংলা ভাষার প্রবাদ-তোরঙ্গটি খুলুন। দেখবেন, ওখানে লেখা আছে হাজার রকমের গরুবন্দনা। ‘গোনা গরু বাঘে নেয় না’, ‘গাই নাই তো বলদ দুয়ে দে’, ‘গাঁয়ের গুণে গরু বিকায়’, ‘গাই ছিল না হল গাই, চালুনি দিয়ে দুইতে যাই’, ‘গাছে গরু চরানো’, ‘কানা গরু বামনকে দান’, ‘গোকুলের ষাঁড়’, ‘গোবর গণেশ’, ‘কানা গরুর ভিন্ন মাঠ’, ‘কুঁড়ে গরুর এটুলী সার’, ‘ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়’ ইত্যাদি হাজারো প্রবাদ বাক্য তো গরুই ভাষাকে দান করেছে। ‘চিনির বলদ’ আর ‘কলুর বলদের’ কথা নাইবা বললাম।
প্রায় পৌনে দুশ’ বছর আগে অক্ষয়কুমার দত্ত গরুকে বলেছেন ‘বুদ্ধিজীবী’। তার বিবেচনায় গরু, ছাগল, ভেড়া—সবাই ‘বুদ্ধিজীবী’। এখন বুদ্ধিজীবীরাও এক ধরনের জীব!
মজার ব্যাপার হচ্ছে ‘মার্ডার’ শব্দটি দিয়ে আমরা হত্যা বা হত্যাকাণ্ড বুঝলেও একজন ইংলিশ ভাষী শব্দটি দিয়ে ‘গরুর পাল’ও বুঝে নেবেন বাক্যের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায়।
রোমন্থক প্রাণী গরু বোভাইন গোত্রের অন্তর্গত। ভারতে ধর্মীয় কারণে এটি বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা পায়। বিশ্বে প্রায় ১৩০ কোটি গরু রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
মানুষকে ‘গরু’ বলে গালি দিলেও গরুকে কেউ ‘মানুষ’ বলে গালি দেয় না। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও গরুর সদম্ভ উপস্থিতি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ নির্বাচনে মার্কা হিসেবে গরু নিলে প্রচারে অনেক সুবিধা হতে পারে। কারণ ঘোড়া হাতির চেয়ে গরু যে অনেক সহজলভ্য!
আমাদের দেশে গরু এবং হাম্বা বর্ণপরিচয়ের মতো। বাংলাদেশের শিশুমনের মধ্যে যে দুই-তিনটা প্রাণীর ডাক কড়া ছাপ ফেলে, সেগুলো হলো হাম্বা, ম্যাও, কা-কা-কা।
দুর্জনেরা দাবি করছেন, এতদিনে গরুকুলের কোনো দাবি-দাওয়া ছিল না। হালে একটি দাবি নাকি জোরালো হয়ে উঠছে। গরুকুল মিডিয়ার কল্যাণে হাজারো প্রমাণ-সাপেক্ষে দাবি করতে পারছে: লাঙ্গলবিহীন দ্বিপদ গরুগুলো আজকাল লাঙ্গলওয়ালাদের হার মানিয়ে দিচ্ছে! দ্বিপদরা যখন-তখন কষে ল্যাং মেরে স্বজাতিরই কাউকে না কাউকে খতম করে দিচ্ছে। এই সো-কল্ড দ্বিপদীদের কারণে ওপরের মাওলা নাকি গরুদের প্রমোশন স্টপ করে রেখেছেন! তাই লেজওয়ালা চৌপদীরা নাকি অভিন্ন কণ্ঠে দাবি জানাতে চাইছে: ‘আমরা মানুষ হতে চাই। কারণ মানুষ আর আমাদের মধ্যে কোনো চেতনাগত পার্থক্য নেই।’
দুর্মূখেরা আরো বলছেন, মানুষের লেজ দৃশ্যমান নয় বলেই ‘লেজেগোবরে’ শব্দটি মানুষ অন্যায়ভাবে লেজযুক্ত গরুর ঘাড়ে চাপিয়ে অনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। তাই গরুকুল নাকি তাদের নিজস্ব সমাজে জঘন্য গালি হিসেবে চালু করতে চাইছে ‘মানুষ’ শব্দটি!
এই দাবির সত্যতা নিয়ে বিজ্ঞজনেরা মুখ খুলতে পারেন। অন্তত বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী উপাধিতে ভূষিত হতে গরুর আর কত চেষ্টা করতে হবে—সেটা নিয়েও তারা মতামত ঢালতে পারেন।
যাই হোক, ষাঁড় কিন্তু রং দেখতে পায় না। বলা যায়, ওদের জীবনটা ‘সাদা-কালো’ ছাড়া আর কিছু নয়। আবার গরু সম্ভবত সংগীতপ্রেমী। গবেষণায় দেখা গেছে, দোহনকালে মৃদু তালে সংগীত বাজালে গরু দুধ বেশি দেয়।
গরু নিয়ে আর কিছু বলার কি দরকার আছে? আমি তো ছার, খোদ কবিগুরুর গোবন্দনার উদাহরণ দিয়ে ইতি টানছি:
শুভ্র খণ্ড মেঘ
মাতৃদুগ্ধ পরিতৃপ্ত সুখনিদ্রারত
সদ্যোজাত সুকুমার গোবৎসের মতো
নীলাম্বরে শুয়ে...