যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পাঠপ্রতিক্রিয়া: লালন সাঁইয়ের দর্শন কি শ্রেণিসংগ্রাম

প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনার খোরাক

সোহানুর রহমান

প্রকাশ : বুধবার, ২১ অক্টোবর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনার খোরাক

সাম্প্রতিক সময়ে সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত ‘লালন সাঁইয়ের দর্শন কি শ্রেণিসংগ্রাম’ শীর্ষক নিবন্ধটি অত্যন্ত মননশীল, সময়োপযোগী এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনার খোরাক জোগানো একটি অনবদ্য রচনা। আমাদের সমাজে লালন সাঁইকে সাধারণত কেবল একজন মরমি সাধক, বাউলসম্রাট কিংবা লোকসংগীতের স্রষ্টার গণ্ডিতেই আবদ্ধ করে রাখার যে সাধারণ রেওয়াজ রয়েছে, আলোচ্য নিবন্ধটি অত্যন্ত সুচারুভাবে সেই প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে এক নতুন চিন্তার দুয়ার উন্মোচন করেছে।

নিবন্ধকার অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে কার্ল মার্কসের সুসংবদ্ধ রাজনৈতিক তত্ত্বের পাশাপাশি লালনের ফকিরি মতাদর্শের একটি তুলনামূলক অথচ বাস্তবসম্মত রেখাচিত্র তুলে ধরেছেন। লালনের রচনায় সরাসরি অর্থনৈতিক শ্রেণিসংগ্রামের আধুনিক রূপরেখা বা কর্মসূচি না থাকলেও, সমাজসৃষ্ট জাতপাত, ধর্মীয় বিভাজন এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে তার দর্শন যে কত তীব্র ও শক্তিশালী একটি প্রতিবাদ ছিল, তা এই লেখায় অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠভাবে উঠে এসেছে। বিশেষত, ‘জাত গেল জাত গেল বলে’ কিংবা ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—এই কালজয়ী পঙ্ক্তিগুলোর যে সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিবন্ধকার হাজির করেছেন, তা পাঠককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। লেখক অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে, আধ্যাত্মিক সাম্য আর অর্থনৈতিক সমতা এক না হলেও, জাতপাত ও ধর্মীয় শুচিতার নামে সমাজে যে বিভাজন ও আধিপত্য জারি থাকে, লালন তার মানবকেন্দ্রিক দর্শনের মাধ্যমে ঠিক সেই বৈষম্যের শেকড়েই আঘাত করেছিলেন।

প্রবন্ধটির সবচেয়ে শক্তিশালী ও আকর্ষণীয় দিক হলো এর বস্তুনিষ্ঠতা। লেখক কেবল অন্ধভক্তি বা আবেগের বশবর্তী হয়ে লালনের মূল্যায়ন করেননি; বরং তার দর্শনের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিবাদী সম্ভাবনার জায়গাগুলোও অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। প্রবন্ধটি এই সত্যকে স্পষ্ট করে তুলেছে যে, শ্রেণিশাসন কেবল অর্থনীতি দিয়ে টিকে থাকে না, বরং সামাজিক মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য দিয়েও শোষণের ভিত মজবুত করা হয়। আর লালন ঠিক এখানেই তার সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের দেয়াল তুলেছিলেন, যা প্রান্তিক মানুষের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক অমোঘ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। দেহতত্ত্ব এবং গুরুবাদের মতো বিষয়গুলো কীভাবে প্রচলিত সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের বিপরীতে একটি বিকল্প ও সাম্যবাদী সাধনপরিসর তৈরি করেছিল, তার ব্যাখ্যাটি ছিল সত্যিই অসাধারণ।

বর্তমান সমাজবাস্তবতায় যখন ধর্ম, জাতি, পেশা ও সামাজিক মর্যাদার অহমিকায় মানুষকে ক্রমাগত বিভক্ত করার সংকীর্ণ প্রবণতা চারদিকে দৃশ্যমান, তখন এই নিবন্ধটি এক উজ্জ্বল আয়নার মতো কাজ করে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। লালন সাঁইয়ের দর্শনকে কেবল বিনোদন বা আধ্যাত্মিকতার মোড়কে না রেখে, সামাজিক বৈষম্যহীনতার এক নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি হিসেবে মূল্যায়নের যে সুচিন্তিত তাগিদ প্রবন্ধকার দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

এমন একটি বিশ্লেষণধর্মী, গভীর ও সমাজ-সচেতন নিবন্ধ উপহার দেওয়ার জন্য লেখককে আন্তরিক সাধুবাদ জানাই। এই লেখাটি কেবল লালন-অনুরাগীদেরই নয়, বরং সাম্য ও মানবিক মর্যাদায় বিশ্বাসী যেকোনো সচেতন পাঠককে গভীরভাবে আলোড়িত করবে এবং বাংলার লোকজ দর্শনের সমাজতাত্ত্বিক পাঠে নতুন এক মাত্রার সংযোজন ঘটাবে।

লেখক: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)