সম্পাদকীয়
যশোরে তরুণী তাসফিয়া ফাতেমা মাহির আত্মহত্যার খবর আমাদের মনে প্রশ্ন জাগাচ্ছে- আমরা কী ধরনের সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে ফেসবুকের ক্লিক আর টিজিং নামক ‘মজা’ একজন কিশোরীকে জীবন-বিসর্জন দিতে বাধ্য করে? মাহির বিদেহি আত্মা আজ আমাদের সামনে আয়না ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সেই আয়নায় আমরা নিজেদের অসহায়তা, আইনের শিথিলতা আর সামাজিক বোধের চরম ব্যর্থতা দেখতে পাচ্ছি।
প্রথমেই স্পষ্ট করে বলতে হবে, ৩৫ বছর বয়সী কোনো ব্যক্তির জন্য ১৭ বছরের এক কিশোরীকে বারবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা কোনো রোমান্টিক আকর্ষণ নয়, এটি শিকার খোঁজার এক জঘন্য মানসিকতা। এটি সাইবার বুলিংয়েরই একটি রূপ, যা এই সমাজে হরহামেশা ঘটছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে নারীদের শরীর ও মন এখনও ‘পাবলিক প্রপার্টি’-র মতো বিবেচিত হয়। ফুফাতো ভাইয়ের মতো আত্মীয়ের কাছ থেকেও যখন এই নির্যাতন আসে, তখন তার মাত্রা আরও ভয়াবহ হয়। মাহি কোথায় যাবে? কাকে বলবে? পরিবারের সঙ্গেই তো অত্যাচারী আত্মীয়। সমাজের ‘সম্মান’ আর ‘লজ্জা’-র বেড়াজালে আবদ্ধ একজন তরুণীর কাছে একসময় দরজা বন্ধ হয়ে যায়। আর সেই দরজার শেষ প্রান্তটি হয় ফ্যানের সঙ্গে ওড়না।
এই ঘটনা একক কোনো পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের আইন, আমাদের অভিভাবকত্ব ও আমাদের ডিজিটাল সাক্ষরতার ব্যর্থতার জীবন্ত প্রমাণ। একটি মেয়েকে কীভাবে অনলাইন নির্যাতন মোকাবিলা করতে হয়, কার কাছে সাহায্য চাইতে হয়, কীভাবে মানসিক চাপ সামলাতে হয়- তা শেখানো হয় না। অথচ আমরা চাই তারা নিজেদের ‘ইমেজ’ রক্ষা করুক। কিন্তু ইমেজ রক্ষার নামে তাদের জীবন রক্ষার পদ্ধতিটা শেখাই না।
পুলিশ অভিযুক্তকে ধরার চেষ্টা করছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে। এই আইনি প্রক্রিয়া যেন দ্রুত ও ন্যায্য হয়, সেদিকে সবার নজর থাকা জরুরি। কিন্তু একইসঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে, শাস্তি কি আত্মহত্যা ফিরিয়ে আনতে পারে? শাস্তি হয়তো অন্যকে সাবধান করবে, কিন্তু মাহিকে তো ফিরিয়ে আনবে না। তাই শাস্তির চেয়েও বড় সমাধান হলো প্রতিরোধ।
এখন অল্পবয়সীদের হাতেও স্মার্ট ফোন। ফলে পরিবারকে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে তাদের সন্তান অনলাইনে কীভাবে বিচরণ করে। পরিবারের ছোটদের ফেসবুক বন্ধু তালিকা, মেসেজ ও অনলাইন আচরণ সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাইবার বুলিং ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। হয়রানিমূলক বার্তা ও আচরণ শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
মাহি আজ নেই। কিন্তু তার মৃত্যু যেন নিষ্ফল না হয়। এই ঘটনা আমাদের প্রত্যেককে নিজের আচরণ পর্যালোচনা করার আহ্বান জানায়। ফেসবুকে ‘লাইক’ আর ‘কমেন্টের’ আড়ালে কতটা বাস্তবিক কষ্ট লুকিয়ে থাকে, তা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। আমরা যদি আজই সামাজিক মাধ্যমের এই কালো দিকটির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিই, তাহলে আগামীকাল আরও অনেক মাহি আমাদের মাঝ থেকে চলে যাবে নীরবে, নিঃস্বরে, শুধু একটি ‘টিজিং’ এর আড়ালে চাপা পড়ে।
আমরা কি এই সমাজ চাই? যদি না চাই, তবে আজ থেকেই কথা বলা শুরু করুন। আপনার বাড়িতে, আপনার ফিডে, আপনার চেনাজানা প্রতিটি তরুণীকে বলুন, তোমার শরীর, তোমার মন, তোমার স্বাধীনতা- এগুলো অলঙ্ঘনীয়। আর কেউ যদি তা লঙ্ঘন করে, তবে লজ্জা তার, তোমার নয়। নীরবতার প্রাচীর না ভাঙতে পারলে আমরা সন্তানদের এমন করুণ পরিণতি দেখতেই থাকবো।