স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
যশোর জেনারেল হাসপাতালে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন রোগী ও স্বজনরা। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়া রোগী কিংবা মৃতদেহ নিজস্ব কোনো বাহনে নিয়ে যেতে চাইলে বা হাসপাতালে আনতে গেলেই বাধা দিচ্ছেন এই চালকরা। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে ওই সিন্ডিকেটের বেঁধে দেওয়া অতিরিক্ত টাকা গুনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করছেন।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) চৌগাছায় ক্যানসারে আক্রান্ত আয়াত খাতুন (৭) নামের এক শিশুর লাশ নিয়ে তার স্বজনরা বাড়ি ফেরার চেষ্টা করলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে তারা এই অ্যাম্বুলেন্স চালকদের বাধার মুখে পড়েন। এ সময় হাসপাতালে কর্তব্যরত এক পুলিশ সদস্য এই অমানবিক ঘটনার প্রতিবাদ করলে চালকরা তার ওপর চড়াও হন এবং মারমুখী আচরণ করেন। বিষয়টি তখনই পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের অবহিত করা হলে কোতোয়ালি থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে দুই অ্যাম্বুলেন্স চালককে আটক করে।
আটক দুইজন হলেন, শহরের ঘোপ এলাকার আবু সায়েদ মিঠু ও কামাল হোসেন। তারা দুজনেই স্থানীয় বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক সমিতির সদস্য।
হাসপাতাল ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা বাসাবো এলাকার রড মিস্ত্রি আলাউদ্দিনের সাত বছর বয়সী কন্যাসন্তান আয়াত খাতুন দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিল। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আয়াতকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার সহকারী রেজিস্ট্রার মো. আনসার আলী তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যুর পর শিশুটির মা সীমা খাতুন ও বাবা আলাউদ্দিন লাশ দাফনের জন্য চৌগাছা উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে নানা শাহিনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হাসপাতালের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স বা অন্য কোনো বাহনে লাশটি নেওয়ার জন্য তারা জরুরি বিভাগের সামনে স্ট্রেচারের ওপর রেখে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় সেখানে ওত পেতে থাকা বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লাশ নিতে বাধা দেন এবং চড়া ভাড়ায় তাদের অ্যাম্বুলেন্স নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন।
এই অমানবিক দৃশ্য দেখে সেখানে ডিউটিরত জেলা বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পুলিশ সদস্য সুজন হোসেন এগিয়ে যান এবং বাধা দেওয়ার কারণ জানতে চান। এতে চালকরা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়ায় এবং চালক সমিতির অন্য সদস্যরা জড়ো হয়ে পুলিশ সদস্যের সঙ্গেও মারমুখী আচরণ করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হাসপাতাল ক্যাম্পাসে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কোতোয়ালি থানায় খবর দেয়। পরে থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এসে ঘটনাস্থল থেকে বাধা প্রদানকারী দুই চালক মিঠু ও কামালকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এরপর পুলিশ পাহারায় মৃত শিশুর লাশ চৌগাছায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত প্রায় এক দশক ধরে যশোর জেনারেল হাসপাতাল এলাকায় 'বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক সমিতি'র নামে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। হাসপাতালকে কেন্দ্র করে তারা নিজস্ব আলাদা প্রশাসন চালাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকায় প্রশাসন বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এদের বিরুদ্ধে কোনো স্থায়ী বা কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে না।
এই বিষয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত জানান, অ্যাম্বুলেন্স চালকরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গেলে জীবননাশের হুমকি দিয়ে থাকে। জেলা প্রশাসনের মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুম খান জানান, লাশ পরিবহনে বাধা ও পুলিশের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের অভিযোগে দুজনকে আটক করা হয়েছে। হাসপাতালের এই অবৈধ সিন্ডিকেট ও জনদুর্ভোগ বন্ধে সমন্বিত প্রশাসনিক তৎপরতা প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এই ঘটনার পর জরুরি বিভাগের সামনে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো হাসপাতাল চত্বরে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের স্থায়ী অবসান এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।