সুবর্ণভূমি ডেস্ক
অর্থ পাচারকারী ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ব্যবসা সামলাতে বাংলাদেশে ফিরছেন তার আপন মামাতো ভাই এবং আর্থিক খাতের মাফিয়া ডা. জোনায়েদ শফিক। তিনি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের আপন খালাতো ভাই। চিকিৎসা খাত থেকে আর্থিক খাতের মাফিয়া বনে যাওয়া এই চিকিৎসক ছিলেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসির পরিচালক। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ব্যাংক খাতের মাফিয়াদের সঙ্গে মিলেমিশে দেশের হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন ডা. জোনায়েদ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সুযোগ বুঝে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ডা. জোনায়েদ। এরপর থেকেই তার পাহাড়সম আর্থিক দুর্নীতির তথ্য একের পর এক বেরিয়ে আসতে শুরু করে । পরে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এখন পর্যন্ত তার নামে হওয়া অন্তত ২৬টি মামলার তদন্ত চলছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে। এর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুটি মামলায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়ে চার্জশিট দাখিল করেছে। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছেন । ইতিমধ্যে জোনায়েদ, তার স্ত্রী মাসুমা পারভীন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
বর্তমানে আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করা এই ‘মাফিয়া’ এখন ভোল পাল্টে ‘বিএনপিপন্থি’ সেজে দেশে ফেরার জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে। দেশ ছেড়ে পালানোর পর থেকে দুবাইয়ের বার ও নাইট ক্লাবে আয়েশি জীবন কাটানো ডা. জোনায়েদ এখন বিএনপিপন্থী চিকিৎসক তকমা ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। তিনি নিজেকে বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে জাহির করতে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতা এবং বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে। গত ৩০ জানুয়ারি এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তিনি ১৯৯০-এর দশকে বেগম খালেদা জিয়া ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে চিকিৎসা দেওয়ার দোহাই দিয়ে ১৫ পয়েন্টের একটি ‘ফিরিস্তি’ পেশ করেন, যা মূলত তার দেশে ফেরার ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার একটি কৌশল। জানা যায়, বিএনপির উচ্চপর্যায়ের এক মন্ত্রীর সঙ্গেও এরই মধ্যে যোগাযোগ করেছেন ডা. জোনায়েদ। একই সঙ্গে ড্যাব-এর উচ্চপর্যায়ের নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন তিনি।
ডা. জোনায়েদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, তিনি দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন। এরপর শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে দ্রুত জামিন নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি । তার উদ্দেশ্য, জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় তার হারানো আর্থিক সাম্রাজ্য ও দখল করা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধার করা। সেই সঙ্গে সাইফুজ্জামানের ব্যবসা পরিচালনা করা।
ডা. জোনায়েদের বিরুদ্ধে প্রায় হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থাকাকালীন তিনি পুঁজিবাজার ও ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি সরিয়ে নেন। আর এসব অর্থ প্রতিষ্ঠানের কাজে না লাগিয়ে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। দেশ ছাড়ার আগে তিনি বিভিন্ন ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির নামে ৫৪০ কোটি টাকা ঋণ রেখে যান। ইউসিবি থেকে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার অন্যতম চার্জশিটভুক্ত আসামি তিনি। এই মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী ও তার স্ত্রীও অভিযুক্ত।
হাসপাতালের নামেও জালিয়াতি করেছেন ডা. জোনায়েদ। জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হসপিটালের চেয়ারম্যানের অগোচরে নিজের পরিচালক পদের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেন তিনি। এর মধ্যে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে নেওয়া ৭০ কোটি টাকার মধ্যে অন্তত ১৯ কোটি টাকা তিনি বিদেশে পাচার করেছেন। সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঋণের টাকা খরচ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বসবাসরত তার দুই মেয়ের কাছে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
সাইফুজ্জামান ও সাইফুল আলমের সঙ্গে পারিবারিক পরিচয়ে ডা. জোনায়েদ ইউসিবি, মেঘনা ব্যাংক, পিপলস ব্যাংক এবং ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দখলে নিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন । সেই আধিপত্য ফিরে পেতে বিএনপির ওই মন্ত্রী ও ড্যাবের সবুজ সংকেতের অপেক্ষা করছেন তিনি।
এই বিষয়ে ডা. জোনায়েদের বক্তব্য পেতে একাধিক মাধ্যমে চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সূত্র: আমার দেশ