ফুটবল বিশ্বকাপ মানে শুধু দলগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, ব্যক্তিগত কৃতিত্বেরও মহামঞ্চ। বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের স্বপ্ন যেমন প্রতিটি দলের, তেমনি ফুটবলারদের কাছে বিশেষ মর্যাদার তিনটি ব্যক্তিগত পুরস্কার হলো গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল এবং গোল্ডেন গ্লাভস। নামের সঙ্গে ‘গোল্ডেন’ বা সোনার উল্লেখ থাকলেও মজার বিষয় হলো, এই পুরস্কারগুলোর কোনোটিই কিন্তু খাঁটি সোনার তৈরি নয়।
এবারের ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ইতিহাসের বিশেষ এক আসর। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে এবং প্রথমবার তিনটি দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো- যৌথভাবে বিশ্বকাপের আয়োজন করছে। ১৯ জুলাই ফাইনালের মাধ্যমে পর্দা নামবে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কারা হবে, তা নিয়ে যেমন উত্তেজনা রয়েছে, তেমনি ব্যক্তিগত পুরস্কারের লড়াইও সমানভাবে নজর কাড়ছে ফুটবলপ্রেমীদের।
গোল্ডেন বুট: গোলদাতাদের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাকে দেওয়া হয় গোল্ডেন বুট। প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বের সেরা ফরোয়ার্ড ও স্ট্রাইকাররা এই সম্মান অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামেন। গোলের পর গোল করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে দেওয়া ফুটবলারদের জন্য এটি সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত কোনো ফুটবলার একাধিকবার গোল্ডেন বুট জিততে পারেননি। ফলে প্রতিটি আসরেই নতুন কোনো তারকা এই সম্মানের দাবিদার হয়ে ওঠেন। অনেক ফুটবলারের ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়াটাই হয়ে থাকে সবচেয়ে বড় অর্জন।
নামের সঙ্গে ‘গোল্ডেন’ থাকলেও গোল্ডেন বুট পুরোপুরি সোনার তৈরি নয়। এটি বিভিন্ন ধাতুর সংমিশ্রণে তৈরি হয়, যার মধ্যে পিতল অন্যতম। পরে এর ওপর সোনালি প্রলেপ বা গোল্ড প্লেটিং করা হয়। এ কারণেই ট্রফিটি দেখতে খাঁটি সোনার বুটের মতো লাগে। গোল্ডেন বুটের ওজন প্রায় এক কেজি।
১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ থেকে এই পুরস্কার দেওয়া শুরু হলেও এর প্রকৃত বাজারমূল্য ফিফা কখনও প্রকাশ করেনি। ফলে এর আর্থিক মূল্য নিয়ে রহস্য আজও রয়ে গেছে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন ফ্রান্সের তারকা ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপে। ফাইনালে হ্যাটট্রিকসহ পুরো টুর্নামেন্টে তিনি আটটি গোল করেছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে এই পুরস্কারের দৌড়ে রয়েছেন লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, কিলিয়ান এমবাপে, হ্যারি কেন, লাউতারো মার্টিনেজ এবং ভিনিসিয়াস জুনিয়রের মতো তারকারা। শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠবে সোনালি বুট, তার উত্তর মিলবে ১৯ জুলাই।
গোল্ডেন বল: বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার
বিশ্বকাপের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলোর একটি হলো গোল্ডেন বল। পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সেরা পারফরম্যান্স করা ফুটবলারকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
বিজয়ী নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফিফা টেকনিক্যাল কমিটি একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে। এরপর বিভিন্ন দেশের মিডিয়া প্রতিনিধিদের ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচিত হয় বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়।
গোল্ডেন বলও খাঁটি সোনার নয়। এটি মূলত ব্রোঞ্জের তৈরি একটি ভাস্কর্য, যার ওপর ১৮ ক্যারেট সোনার প্রলেপ দেওয়া থাকে। ফলে এতে সোনার পরিমাণ খুবই সীমিত। এর প্রকৃত মূল্য সম্পর্কেও ফিফা কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে একমাত্র ফুটবলার হিসেবে লিওনেল মেসি দু’বার গোল্ডেন বল জিতেছেন। তিনি ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে এই সম্মান অর্জন করেন।
গোল্ডেন গ্লাভস: গোলপোস্টের প্রহরীদের জন্য
ফুটবলে গোলরক্ষকের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে দেওয়া হয় গোল্ডেন গ্লাভস পুরস্কার। বিশ্বকাপের সেরা গোলকিপার এই সম্মান পান।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবার এই পুরস্কার চালু হয়। শুরুতে এটি ছিল ‘লেভ ইয়াশিন অ্যাওয়ার্ড’, কিংবদন্তি সোভিয়েত গোলরক্ষক লেভ ইয়াশিনের সম্মানে। ২০১০ সালে পুরস্কারটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় গোল্ডেন গ্লাভস।
এই ট্রফিটিও খাঁটি সোনার নয়। সাধারণত ব্রোঞ্জের তৈরি ট্রফির ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়। তাই নামের সঙ্গে ‘গোল্ডেন’ থাকলেও এতে সোনার পরিমাণ খুবই কম।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ গোল্ডেন গ্লাভস জিতেছিলেন। এবারও বিশ্বের সেরা গোলকিপারদের মধ্যে এই পুরস্কার জয়ের লড়াই জমে উঠবে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
সোনার নয়, মর্যাদাই প্রধান
গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল কিংবা গোল্ডেন গ্লাভস- কোনোটিই নিরেট সোনার তৈরি নয়। তবু ফুটবল বিশ্বের কাছে এসব পুরস্কারের মূল্য সোনার চেয়েও বেশি। কারণ এগুলো শুধু একটি ট্রফি নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। তাই বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে দলগত লড়াইয়ের পাশাপাশি এই তিন মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জয়ের প্রতিযোগিতাও থাকে সমান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে।
লেখক: ক্রীড়ালেখক