তসলিম শিমুল
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরুর মাত্র তৃতীয় দিনেই প্রযুক্তিনির্ভর রেফারিং ব্যবস্থা ভার (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপ ঘিরে শুরু থেকেই নানা আলোচনা চলছিল। তবে কাতার ও সুইজারল্যান্ডের ম্যাচে একটি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে ভার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতাকে।
গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটিতে খেলার ১৪ মিনিটে সুইজারল্যান্ড একটি পেনাল্টি পায়। ঘটনাটি ঘটে যখন সুইস ফরোয়ার্ড রেমো ফ্রয়েলার কাতারের ডি-বক্সে প্রবেশের সময় গোলরক্ষকের সংস্পর্শে পড়ে যান। ম্যাচের রেফারি সঙ্গে সঙ্গেই পেনাল্টির বাঁশি বাজান। এরপর ভার-এর সহায়তায় ঘটনাটি পুনরায় পরীক্ষা করা হলেও সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
কিন্তু বিতর্কের সূত্রপাত হয় টেলিভিশন রিপ্লে প্রকাশ্যে আসার পর। ফুটবল বিশ্লেষক, সাবেক খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের অনেকের দাবি, ফাউলের আগে ফ্রয়েলার অফসাইড অবস্থানে ছিলেন। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী আক্রমণভাগের খেলা সেখানেই থেমে যাওয়ার কথা ছিল এবং পেনাল্টি দেওয়ার সুযোগ থাকতো না।
কেন উঠছে বিতর্ক
বর্তমান ফুটবলে অফসাইড নির্ধারণে ব্যবহৃত হচ্ছে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি। খেলোয়াড়দের শরীরের বিভিন্ন অংশে ভার্চুয়াল ট্র্যাকিং পয়েন্টের মাধ্যমে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অফসাইড নির্ণয় করা সম্ভব হয়। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বিতর্ক কমার কথা থাকলেও, কাতার-সুইজারল্যান্ড ম্যাচে ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটেছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, ভার সিদ্ধান্তের পক্ষে যে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড গ্রাফিক্স দেখানোর কথা, তা টেলিভিশন সম্প্রচারে দেখানো হয়নি। ফলে দর্শক এবং বিশ্লেষকদের কাছে পুরো বিষয়টি অস্পষ্ট থেকে যায়।
ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা ফুটবলার ও জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার গ্যারি নেভিল এবং ইয়ান রাইট এই ঘটনায় প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, যদি অফসাইড পরীক্ষা সত্যিই করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রমাণ প্রকাশ্যে দেখাতে সমস্যা কোথায়? স্বচ্ছতার অভাবই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
ফিফার ব্যাখ্যা
ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে ফিফা দ্রুত একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। সংস্থাটির দাবি, ভার দল নিয়ম মেনেই অফসাইড যাচাই করেছে এবং সিদ্ধান্তে কোনো ধরনের ভুল ছিল না।
ফিফা জানিয়েছে, সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির সাহায্যে ঘটনাটি পরীক্ষা করা হয়েছিল। তবে সম্প্রচারের সময় সেই গ্রাফিক্স দেখানো হয়নি। যদিও ভার কর্মকর্তারা নিজেদের মনিটরে প্রয়োজনীয় সব রিপ্লে ও প্রযুক্তিগত তথ্য দেখেছেন এবং তার ভিত্তিতেই রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন।
তবু ফুটবল মহলের একটি বড় অংশ এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। তাদের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি দর্শকদের কাছে সেই তথ্য উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
বিতর্কের আবহের মধ্যেই ম্যাচটি শেষ হয় ১-১ গোলে ড্র দিয়ে। কাতার ও সুইজারল্যান্ড উভয় দলই একটি করে পয়েন্ট অর্জন করে। তবে ম্যাচের ফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে পেনাল্টি ও ভার সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে বিশ্বকাপের তৃতীয় দিনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা স্কটল্যান্ডের জয়। দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপের মূলপর্বে ফিরে এসে স্কটিশরা নিজেদের সমর্থকদের আনন্দের উপলক্ষ এনে দিয়েছে।
হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে জন ম্যাকগিনের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় স্কটল্যান্ড। এই জয়ের মাধ্যমে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও জয়ের স্বাদ পেল তারা।
স্কটল্যান্ডের সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয় ছিল ১৯৯০ সালে, যখন তারা সুইডেনকে হারিয়েছিল। এরপর ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কোনো জয় পায়নি। পরে দীর্ঘ সময় বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গাই করে নিতে পারেনি দলটি। ফলে হাইতির বিপক্ষে এই জয় স্কটিশ ফুটবলের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
প্রযুক্তির যুগেও বিতর্কের অবসান নেই। ভার চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল রেফারিং ভুল কমানো এবং খেলার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু কাতার-সুইজারল্যান্ড ম্যাচ প্রমাণ করে দিলো, প্রযুক্তি থাকলেও বিতর্ক পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ এবং দর্শকদের সামনে তা কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বকাপের মাত্র তৃতীয় দিনেই ভার নিয়ে এমন বিতর্ক ফুটবল বিশ্বকে নতুন আলোচনার খোরাক দিয়েছে। টুর্নামেন্ট যত এগোবে, প্রযুক্তি ও রেফারিং সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও যে আরও বাড়তে পারে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিললো এই ম্যাচেই।
লেখক: ক্রীড়ালেখক