স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে গোলদাতার নাম। কিন্তু আর্জেন্টিনার ২-০ জয়ের দিনে স্কোরবোর্ডে লেখা উচিত ছিল ২৫ জনের নাম। কারণ গোল দুটো মেসির পায়ে, কিন্তু জন্ম দিয়েছে গোটা দল।
প্রথম গোল: আলমাদার ত্যাগ
বাঁ প্রান্ত থেকে মাপা ক্রস বাড়ালেন মেদিনা। এরকম বল মেসি বারবার পেয়েছেন। জর্দি আলবার যুগ থেকে এই বলটাই মেসির স্বাক্ষর। বল আসতেই মেসি শরীর ঘুরিয়ে বাঁ পা তাক করলেন। গোটা স্টেডিয়াম নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে। কিন্তু গল্পের নায়ক তখন অন্য একজন। আলমাদা দৌড়ে এলেন। মেসির ঠিক সামনে, গোলের মুখে। বলটা মাটি কামড়ে আসছে। আলমাদার সামনে দুটো রাস্তা- পা ছুঁয়ে শট নেওয়া, নায়ক হওয়া। নয়তো সরে দাঁড়ানো, মেসিকে পথ ছেড়ে দেওয়া। আলমাদা শেষে পথটা বেছে নিলেন। তিনি দু পা ফাঁক করে দাঁড়ালেন। বলটা তার দু’পায়ের মাঝ দিয়ে যেতে দিলেন। ছুঁলেন না, বাধা দিলেন না, নিজের নামটা লেখালেন না। বলটা আলমাদার দু পায়ের ফাঁক গলে পৌঁছে গেল মেসির বাঁ পায়ে। মেসি আরামসে প্লেস করলেন। ১-০।
একটা গোলের জন্য শট নিতে হয় না। মাঝে মাঝে দু’পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আলমাদা সেটাই করলেন। নিজের সম্ভাব্য গোলটা বিসর্জন দিয়ে মেসির গোলটা বানিয়ে দিলেন।
দ্বিতীয় গোল: পারাদেসের বিনয়
যোগ করা সময়। পেনাল্টি বক্সে বল পেলেন লিওনার্দো পারাদেস। হুলিয়ান আলভারেজের কাছ থেকে পাওয়া বল। সামনে শুধু গোলকিপার আর খোলা জাল। পৃথিবীর ৯৯% ফুটবলার এখান থেকে শট নেন। পারাদেস নিলেন না। এক পলক তাকালেন মেসির দিকে। তারপর বলটা ঠেলে দিলেন মেসির দিকে। চারপাশে ডিফেন্ডারের জটলা। মেসি প্রথম শট নিলেন। ব্লক। দ্বিতীয় শট। আবার ব্লক। তৃতীয় শট। বল জালে। ২-০।
পারাদেস নিজের মুহূর্তটা মেসিকে দিয়ে দিলেন। কারণ এই দলে সবাই জানে, মেসির গোল মানে আর্জেন্টিনার জয়।
দুটো গোল, একটাই দর্শন
মেদিনা ক্রস বাড়ান, আলমাদা দু’পায়ের মাঝ দিয়ে বল ছেড়ে দেন, আলভারেজ বল ছেড়ে দেন, পারাদেস শট না নিয়ে পাস দেন।
স্কালোনি এই দলটাকে শিখিয়েছেন, তারকা হতে হয় না, ভালো খেলোয়াড় মানুষ হতে হয়।
মেসি সত্যিই ভাগ্যবান
জীবনের সব লড়াই হয়তো মানুষ একা লড়ে। কিন্তু যখন ২৫ জনই নিজের নাম, স্বপ্ন, নিজের গোল বিসর্জন দিয়ে দলের রাস্তা বানিয়ে দেয়, তখন সেই লড়াইয়ে হারার কোনো উপায় থাকে না।
মেসি সত্যিই ভাগ্যবান। তার আলমাদা আছেন, যে গোলের সামনে দাঁড়িয়ে দু’পায়ের মাঝ দিয়ে বলটা ছেড়ে দেন শুধু মেসির জন্য। মেসির পারাদেস আছেন, যে শট না নিয়ে বলটা মেসির পায়ে তুলে দেন।
৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষ হয়নি শুধু মেসির বাঁ পায়ের ছোঁয়ায়। শেষ হয়েছে আলমাদার দু’পায়ের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া বিশ্বাসে, পারাদেসের নিঃস্বার্থ পাসে, মেদিনার নিখুঁত ক্রসে।
গোলের খাতায় লেখা থাকবে ‘মেসি ৩৮ মিনিট, ৯০+৪ মিনিট’। কিন্তু আর্জেন্টিনার প্রতিটি সমর্থকের হৃদয়ের খাতায় লেখা থাকবে ‘আলমাদা ৩৮ মিনিট, ত্যাগের ডামি, পারাদেস ৯০+৪ মিনিট, ভালোবাসার পাস’।
একজনের পায়ে গোল, বাকি পঁচিশজনের চোখে পানি। এটাই আর্জেন্টিনা। এটাই মেসির পরিবার।