তসলিম শিমুল
লাউতারো মার্তিনেজের দ্বিতীয় গোলের পর টেলিভিশন ক্যামেরা যখন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির দিকে ঘুরে যায়, তখন ফুটবলপ্রেমীরা দেখেন এক ভিন্ন দৃশ্য। স্কোরবোর্ডে স্বস্তি ফিরলেও তার চোখেমুখে ছিল জমে থাকা চাপের ছাপ। কয়েক মুহূর্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি, যেন দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর লিওনেল মেসিকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিশ্বকাপজয়ী এই কোচ।
স্কালোনির কোচিং নিয়ে সমালোচনার অভাব ছিল না। তার দল নির্বাচন, একাদশ, বদলি খেলোয়াড়- প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তই ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু বড় মঞ্চে আবারও তিনি দেখিয়ে দিলেন, বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, ডাগআউটে বসে সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া তার চেয়ে অনেক কঠিন। আর সেই কারণেই একজন কোচের মূল্যায়ন হয় শেষ পর্যন্ত ফলাফলের মাধ্যমে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে স্কালোনির কৌশলগত পরিবর্তনগুলোই আর্জেন্টিনার ভাগ্য বদলে দেয়। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে তিনি মাঝমাঠ ও উইংয়ে নতুন ভারসাম্য আনেন। ফিজিক্যাল লড়াইয়ে বাড়তি শক্তি যোগ করতে পরিবর্তন আনেন, পরে রদ্রিগো দি পলকে নামিয়ে লং বল ও ট্রানজিশন ফুটবলে গতি বাড়ান। ডান প্রান্তে পরিবর্তন এনে আক্রমণে ক্রসের সংখ্যা বাড়ানো হয়, যা প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করে।
তবে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি আসে ৮০ মিনিটে। স্কালোনি রক্ষণভাগ থেকে একজন খেলোয়াড়কে তুলে আক্রমণভাগে লাউতারো মার্তিনেজকে নামান। সেই সাহসী সিদ্ধান্তের ফল মিলতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। বদলি হিসেবে নেমেই লাউতারো প্রথমে সমতাসূচক গোলের উৎস তৈরি করেন, এরপর দ্বিতীয় গোল করে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন অবিশ্বাস্য জয়। যে ম্যাচে একসময় পরাজয়ের শঙ্কা ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত জয়ে রূপ নেয় কোচের দূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে।
তবে স্কালোনির গল্প শুধু কৌশল বা জয়েই সীমাবদ্ধ নয়। ম্যাচ শেষে হতাশ জুড বেলিংহামের কাছে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ পারফরম্যান্সের জন্য অভিনন্দন জানানো ছিল একজন সত্যিকারের নেতার পরিচয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠের ৯০ মিনিটেই সীমাবদ্ধ। এর বাইরে সম্মান, সৌজন্য ও মানবিকতাই ফুটবলের সৌন্দর্য।
আর্জেন্টিনার এই জয়ে গোলদাতাদের নাম যেমন ইতিহাসে থাকবে, তেমনি ডাগআউটে দাঁড়িয়ে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া লিওনেল স্কালোনির ভূমিকাও সমানভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আবারও প্রমাণ হলো, বড় ম্যাচে শুধু তারকা ফুটবলার নয়, একজন দূরদর্শী কোচও ম্যাচের ভাগ্য লিখে দিতে পারেন।