যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

খাদ্যসংকটে কেশবপুরের কালোমুখো হনুমান

ইমরান হোসেন রাজ

, যশোর

প্রকাশ : শুক্রবার, ৬ নভেম্বর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
খাদ্যসংকটে কেশবপুরের কালোমুখো হনুমান

যশোরের কেশবপুরের ঐতিহ্যবাহী বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমানের সংখ্যা সম্প্রতি বেড়েছে। তবে, সেই তুলনায় সরকারি খাদ্য সরবরাহ না বাড়ায় তীব্র খাদ্যসংকটে পড়েছে প্রাণীগুলো।

ক্ষুধা মেটাতে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হানা দিচ্ছে হনুমান, আর খাদ্যের খোঁজে বেরিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মানুষের কাছে চিকিৎসার আকুতি জানাচ্ছে।

এ অবস্থায় অবিলম্বে বৈজ্ঞানিক উপায়ে হনুমান গণনা করে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশপ্রেমীরা।

কেশবপুরের এই ঐতিহ্যবাহী কালোমুখো হনুমান দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। তবে খাদ্যের তীব্র অভাবে এই আকর্ষণীয় প্রাণীটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

বন বিভাগ ও স্থানীয়দের ধারণা, বর্তমানে কেশবপুর ও আশপাশের এলাকা মিলিয়ে চার শতাধিক হনুমান রয়েছে; গত বছর এই সংখ্যা ছিল আড়াইশ’ থেকে তিনশ’। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো গণনা না হওয়ায় সঠিক সংখ্যা এখনও অজানা। কেশবপুর ও মণিরামপুর উপজেলার অন্তত ১২টি স্থানে এদের বিচরণ বেশি।

সরকারিভাবে প্রতিদিন হনুমানগুলোর জন্য ৪৭ কেজি ২০০ গ্রাম কলা, ছয় কেজি ৭০০ গ্রাম পাউরুটি, সাত কেজি ৩৫০ গ্রাম বাদাম এবং সাত কেজি সবজি বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় এই খাদ্য অতি সামান্য। তার ওপর পরিবহন ও দূরত্বের কারণে প্রতিদিন মাত্র পাঁচ-ছয়টি স্পটে খাবার পৌঁছানো সম্ভব হয় বলে জানান খাদ্য সরবরাহকারী ভ্যানচালক আতিয়ার রহমান।

তিনি জানান, উপজেলা সদর, হাসপাতাল এলাকা, বালিয়াডাঙ্গা, ক্ষতিয়াখালী, মাগুরাডাঙ্গা ও বাঁকাবর্শী-নতুনহাট ছাড়া অন্য এলাকাগুলোতে নিয়মিত খাবার পৌঁছায় না।
অতীত থেকে কেশবপুরের ভোগতী, বালিয়াডাঙ্গা, মধ্যকুল, ক্ষতিয়াখালী, সুজাপুর, ব্রহ্মকাটি, আলতাপোল, বায়সা, রামচন্দ্রপুর, মাগুরাডাঙ্গা এবং মণিরামপুর উপজেলার মুজগুন্নী ও দুর্গাপুর এলাকায় হনুমান বিচরণ করে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি বনজ সম্পদ ও ফলদ গাছ কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে এরা ছড়িয়ে পড়ছে লোকালয়ে ও আশেপাশের এলাকায়। খাদ্যের খোঁজে ঘুরতে গিয়ে প্রায়ই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে কিংবা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হচ্ছে হনুমান।

কেশবপুর শহরের সাহাপাড়ার দোকানদার বিশ্বজিৎ বলেন, ইদানীং হনুমানের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে ওরা দোকানে ঢুকে বিস্কুট, চিপস বা বাজারের প্যাকেট নিয়ে যাচ্ছে।

খাদ্যের অভাবে আহত হনুমানের মানুষের কাছে শরণাপন্ন হওয়ার মানবিক দৃশ্যও দেখা গেছে সম্প্রতি। খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে আহত হওয়া একটি হনুমান শহরের ত্রিমোহিনী মোড়ে এসে চিকিৎসার আকুতি জানায়।

স্থানীয় সংবাদকর্মী আব্দুর রহমান হনুমানটির কাছে গেলে সে তার কাঁধে উঠে বসে। পরে তাকে দ্রুত একটি ফার্মেসিতে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

কালোমুখ হনুমানের বৈজ্ঞানিক নাম Semnopithecus entellus। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, এই প্রজাতির হনুমান প্রায় ২০০ বছর ধরে যশোরের কেশবপুর ও মণিরামপুর অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। এদের গড় আয়ু ১৮-৩০ বছর। সাধারণত জুলাই-অক্টোবর বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল এদের প্রজননকাল। স্ত্রী হনুমান ২০০ থেকে ২১২ দিন গর্ভধারণের পর সাধারণত ১-২টি বাচ্চা প্রসব করে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন)-২০১২ অনুযায়ী হনুমানের এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।

কেশবপুর পৌরএলাকার বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, ‘কালোমুখ হনুমান আমাদের ঐতিহ্য। কিন্তু তাদের থাকার নিরাপদ জায়গা, প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবারের কারণে এখন এই হনমুানগুলো স্থান ছেড়ে যাচ্ছে। তারপরও কেশবপুর শহরে বিশেষ করে উপজেলা চত্বর, হাসপাতাল চত্বরে তাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সরকারের উচিৎ বিলুপ্তপ্রায় এ প্রজাতির প্রাণীটি সংরক্ষণে আরও বেশি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।’

উপজেলা বন কর্মকর্তা সমীরণ বিশ্বাস বলেন, সম্প্রতি কেশবপুরে হনুমানের সংখ্যা বেড়ে চার শতাধিক হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একটি আনুষ্ঠানিক গণনা সম্পন্ন হলে এদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ ও সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসেন বলেন, উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় হনুমান ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নজরে এসেছে। গবেষণা দল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এদের প্রকৃত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কথিত আছে, ব্রিটিশ আমলে দক্ষিণ ভারতের কয়েকজন মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী ব্যবসার উদ্দেশ্যে কেশবপুরে আসেন। তারা কয়েকটি কালোমুখ হনুমান সঙ্গে এনেছিলেন। এখনকার হনুমানগুলো তাদেরই বংশধর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে এখানে দুই হাজারের মতো কালোমুখ হনুমান ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে, বন উজাড়করণ, গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, খাদ্যাভাব এবং মানুষের অত্যাচারে তাদের সংখ্যা কমতে থাকে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)