মেহেরপুর প্রতিনিধি
মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ। গাছে গাছে আগাম ফুলকপি। ফলনও হয়েছে ভালো। মৌসুমের শুরুতে দামও ছিল আশানুরূপ। কিন্তু বীজ, সার, শ্রমিকের মজুরি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই স্বস্তি এখন দুশ্চিন্তায় রূপ নিয়েছে।
এক দিনের ব্যবধানে কমেছে ফুলকপির দাম, অন্যদিকে বেড়েছে বাজারজাতকরণের খরচ। ফলে ভালো ফলন পেয়েও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন মেহেরপুরের কৃষকেরা।
কৃষকের শ্রম, পরিচর্যা ও বিনিয়োগে গড়ে ওঠা ফুলকপির ক্ষেত ঘিরে তাদের স্বপ্ন ছিল উৎপাদন খরচ তুলে কিছুটা লাভের মুখ দেখা। কিন্তু উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি সেই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি ফুলকপি ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এক দিনের ব্যবধানে দাম নেমে এসেছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাজারজাতকরণের ব্যয়। ফলে ভালো ফলন হলেও কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কৃষকেরা জানান, আগে প্রতি কেজি ফুলকপি চট্টগ্রামে পাঠাতে পরিবহন খরচ পড়তো প্রায় ছয় টাকা। বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তা দাঁড়িয়েছে ১৩ থেকে ১৫ টাকায়। একই সঙ্গে প্যাকিংয়ের কাগজের দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে। বেড়েছে বস্তা ও শ্রমিকের খরচও। এভাবে ব্যয় বাড়তে থাকলে ফুলকপি চাষে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
শুধু পরিবহন নয়, ফুলকপি উৎপাদনের প্রতিটি ধাপেই বাড়তি খরচের চাপ রয়েছে। বীজ, রাসায়নিক সার, জমির পরিচর্যা, শ্রমিকের মজুরি ও প্যাকেজিং—সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। অথচ বাজারে দাম কমে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটছে কৃষকদের।
সাহারবাটি গ্রামের কৃষক জাব্বারুল ইসলাম বলেন, এ বছর বাড়তি দাম দিয়ে বীজ ও চারা কিনতে হয়েছে। এরপর বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। সারের জন্য ডিলারের দোকানে দোকানে ঘুরেও চাহিদামতো সার পাওয়া যায়নি। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি এবং কাগজ ও বস্তার দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা লাভের মুখ দেখতে পারছেন না।
একই এলাকার কৃষক সাগর মিয়া বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচও বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি সবজি চট্টগ্রামে পাঠাতে ছয় টাকা খরচ হতো। এখন তা বেড়ে ১৩ থেকে ১৪ টাকা হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, বীজের দাম কমানো, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে রাসায়নিক সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবহন ব্যয় কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে সবজি উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন অনেক কৃষক।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে মেহেরপুর জেলায় ৪৬৫ হেক্টর জমিতে ফুলকপির আবাদ হয়েছে। এ মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন। এ ছাড়া শীতকালীন মৌসুমে ফুলকপির আবাদ হয়েছে এক হাজার ২৫৩ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৩১ হাজার ৯১ মেট্রিক টন।
জেলার চাহিদা মিটিয়ে মেহেরপুরের ফুলকপি ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
এ বিষয়ে গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, কৃষকেরা যাতে সহজে সার, কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ পেতে পারেন, সে লক্ষ্যে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। ভালো ফলন পেতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
ভালো ফলন ও বাজারে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যয়ের চাপে ফুলকপি চাষিদের লাভ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কৃষকদের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যয় কমানো এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ফুলকপি চাষে ফিরবে স্বস্তি।