সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
কালিগঞ্জে প্রান্তিক কৃষকদের পকেট থেকে ৭৫ কোটি টাকা লুটে নেওয়ার তথ্য ফাঁস হওয়ার পর উপজেলাজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তদন্তের ভয়ে অভিযুক্ত কৃষি কর্মকর্তা, সিন্ডিকেটভুক্ত ডিলার এবং সুদের কারবারি মহাজনদের মধ্যে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কৃষি কর্মকর্তা ওয়াসীম উদ্দীনের ‘ওপর মহলে লম্বা হাত’ থাকার দম্ভোক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেলা ও উপজেলা কৃষি অফিসের অন্দরে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে অসাধু ডিলারদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছেন। একইসঙ্গে সারের অতিরিক্ত মূল্যের রসিদ গোপন করতে এবং ভুয়া মাস্টাররোল তৈরি করে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ‘তদন্তের নামে’ কৃষকদের মুখ বন্ধ রাখার প্রচ্ছন্ন হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকী স্থানীয় একজন চেয়ারম্যানকে ‘ম্যানেজ’ করার পাঁয়তারাও চলছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, কর্মকর্তাদের খুঁটির জোর কোথায় যে তারা ‘বদলি করে লাভ নেই’ বলে হুংকার দিচ্ছেন? গুঞ্জন রয়েছে যে, এই ‘সাদা কলারের’ অপরাধীরা এখন ঢাকায় উচ্চমহলে তদবিরের মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ভুক্তভোগী কৃষক সিরাজুল ইসলাম ও এশার আলীর মতো শত শত কৃষক এখন সংগঠিত হচ্ছেন। তারা বলছেন, ‘আমাদের ঘামে ভেজা টাকা দিয়ে যারা এসির মধ্যে অফিস করে কৃষকদের খবর রাখে না, তাদের ছাড়বো না। হিসাব এবার মাঠেই হবে।’
মাঠপর্যায়ে কৃষকরা এখন সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি দেখলেই ধিক্কার জানাচ্ছেন এবং অবিলম্বে ওয়াসীম উদ্দীনের অপসারণসহ লুটে নেওয়া টাকা পুনরুদ্ধারের দাবি জানাচ্ছেন।
গত ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, কালিগঞ্জে এ বছর সাত হাজার ২৫৮ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে বিঘা প্রতি অতিরিক্ত খরচ চাপিয়ে কৃষকদের থেকে ২৭ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ধানের সরকারি দর কেজি প্রতি ৩৬ টাকা হলেও সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা ২৫-২৬ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, যাতে লোকসান হয়েছে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ ৬৫ হাজার ২২২ টাকা।
মৌতলা ইউনিয়নের সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, প্রতি বস্তা সারে তার থেকে ৪৫০ টাকা বেশি নেওয়া হয়েছে। গোবিন্দপুরের এশার আলীও একই অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, উপজেলা কৃষি অফিসারসহ ১০৯ জনের একটি সিন্ডিকেট নেটওয়ার্ক কৃষকদের শোষণ করছে।
কালিগঞ্জের সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ডিলারদের সাথে কর্মকর্তাদের এই অশুভ আঁতাত বন্ধ না হলে এবং দুদক যথাযথ তদন্ত শুরু না করলে তারা বৃহত্তর আন্দোলনে নামবেন। কালিগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতি এখন চরম উত্তেজনাকর; কৃষকের এই অসন্তোষ অচিরেই গণবিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।