যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সাংবাদিকতার দায় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বাচালতা

সরোয়ার হোসেন

প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর,২০২৬, ০১:০০ এ এম
সাংবাদিকতার দায় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বাচালতা

‘প্রথম আলো’ অনলাইনে গত ১২ সেপ্টেম্বর একটা লেখা পড়লাম ‘পুলক চ্যাটার্জিরা কেন হেরে যাচ্ছে’ শিরোনামে। লেখক নাদিম মাহমুদ। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছেন। শিরোনাম দেখে খুব আগ্রহ নিয়েই লেখাটা পড়তে শুরু করলাম। এর শুরুতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলো নিজেদের সমালোচনা পত্রিকায় ছাপাতে বা প্রকাশ করতে অনীহা প্রকাশ করে। সাংবাদিকেরা প্রতিদিন অন্যের অধিকার, অন্যায়, দুর্নীতির খবর তুলে আনেন, অথচ নিজেদের বেতন-ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা আর পেশাগত সম্মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে তা ছাপানোর মতো কেউ থাকে না।’

লেখাটিতে সমকাল সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি থেকে ‘আজকের পত্রিকা’র বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু বা পরিণতি নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লেখাটি পড়তে চেয়েছিলাম, তার আশপাশ দিয়ে গেলেও লেখক মোদ্দা কথাটি বলেছেন বলে আমার অন্তত মনে হয়নি।

এখানে আমার ভাবনার জায়গা দুটো—হয় ‘প্রথম আলো’ লেখাটিতে কাচি চালিয়েছে, না হয় লেখকই ‘চটকদার শিরোনাম’ দিয়ে পাঠককে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। ফলে বাংলাদেশের মিডিয়া এবং পুলক চ্যাটার্জিদের ট্রাজেডির আদ্যপান্ত পড়ার যে আগ্রহ আমার মাঝে তৈরি হয়েছিল তার ছিটেফোঁটাও ওই লেখাতে পাওয়া যায়নি। তবুও লেখক নাদিম মাহমুদ একটা সত্য সামনে নিয়ে আসার যে চেষ্টা চালিয়েছেন, সে জন্য তিনি ধন্যবাদ পেতে পারেন।

২.

বাংলাদেশের মিডিয়ায় ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি সাংবাদিক-কর্মচারীদের জন্য যায় কি না তা ভেবে দেখবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু, আমরা ভাবি না। পরাধীনতাকে নিয়তি মেনে নিয়েই আমরা এখানে মিডিয়াতে কাজ করি, কেউ সাংবাদিক হই, কেউ কর্মচারী বা প্রশাসনিক হর্তাকর্তা। দিন শেষে সবাই কিন্তু একই সুতোয় বাঁধা। মুখে হম্বিতম্বি করলেও নিজের যখন সময় আসে, দেখা যায় তার মতো পরাধীন ব্যক্তি এই কর্মক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি আর নেই। এর মাঝে বাকিটা সময় শুধুই সুতোর টানে নেচে চলা।

আবার মিডিয়া মালিকেরাও কী স্বাধীন?—সেই প্রশ্নটিও অবান্তর নয়। এখানে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র থেকে পাঠানো বিশেষ প্রেসক্রিপশনে কোন রিপোর্টটি ছাপাতে হবে, কোনটি ছাপানো যাবে না—সবই নির্ধারণ করা হয়। স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে সামরিক জান্তা মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করতো। বন্যার পানিতে দাপাদাপি করে দেশদরদি সাজা জান্তাপ্রধানের ছবি সে সময়ের পত্রিকাগুলোকে প্রধান শিরোনাম করতে বাধ্য করা হয়েছে।

অন্যদিকে, আত্মসমর্পণের নজিরও দেখা গেছে বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী জমানায়। সরকারি ফরমায়েশের পাশাপাশি সেলফ সেন্সরশিপ বেছে নিয়েছিলেন অনেক সম্পাদক, ডাকসাইটে সাংবাদিক ও সাংবাদিকনেতা। হালুয়া-রুটির সেই ভাগ-বাটোয়ারার উচ্ছিষ্টভোগীরা এখনো পতিত ফ্যাসিস্টের জয়গান গেয়ে চলেছেন। নানা উছিলায় তারা নিজেদের মিডিয়ায় ফ্যাসিবাদের উপস্থিতি ঘটানোর কসুর করতে পিছপা হচ্ছেন না।

ফলে স্বাধীনতাহীনতা এবং পরাধীনতায় আবদ্ধ হওয়ার উদগ্র বাসনায় সেলফ সেন্সরশিপ মাথা পেতে নিয়ে আর যাই হোক পেশাগত সম্মান প্রত্যাশা করা যায় না। এর বাইরে যিনি বা যারা সত্যিকার অর্থেই সাংবাদিকতা পেশার মাহাত্ম্য তুলে ধরতে চেয়েছেন তাদেরই থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে শুরু করে দলীয় ক্যাডার—সর্বত্রই আক্রান্ত হয়েছেন বিবেকবান সাংবাদিক, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। একের পর এক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সত্য তুলে ধরা মিডিয়াগুলোকে। দখল করে নেওয়া হয়েছে অনেকগুলো। যেসব সাংবাদিক-সম্পাদক সত্য প্রকাশে অবিচল থাকতে চেয়েছেন তাদেরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেককে সাজানো মামলায় আটক করে নিষ্ঠুর ও অমানবিক অত্যাচার চালানো হয়েছে। নির্মম পরিহাস, যারা সেই সময় এসব অন্যায় আর অত্যাচারকে ‘জায়েজ’ করার চেষ্টা করেছিল সেই ‘বেকুবরাই’ এখন পেশাদারিত্বের দোহাই দিয়ে সাংবাদিকতার সবক দিতে আসছেন।

৩.

আসলে বাংলাদেশের পুলক চ্যাটার্জিদের (সাংবাদিকদের) নিয়তি, বিভুরঞ্জন সরকারদের নিয়তি একই! যে নিয়তি সরকার আর অধিকাংশ মিডিয়া মালিক নির্ধারণ করে দিয়েছেন! সাংবাদিকতা এখানে শিল্প হিসেবে আলোচিত হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি মালিকপক্ষের বিত্ত-বৈভব আর সোশ্যাল স্ট্যাটাস গড়ার হাতিয়ার। ট্রেড ইউনিয়নগুলোর বদৌলতে সাংবাদিকরা এখানে ‘শ্রমিক’ হিসেবে গণ্য হন বটে, আদতে সবাই ক্রীতদাস। সাংবাদিককে বাধ্য করা হয় সাংবাদিকতা বাদ দিয়ে শুধু লেবাসটা ধারণ করতে। কারণ এই লেবাসটা খুব জরুরি। যা দিয়ে সে আড়াল করতে পারে নিজের ক্ষত এবং মালিকের আগ্রাসী চরিত্রকে। এরজন্য যা যা করণীয় তার সবই করা হয় সাংবাদিককে দিয়ে; শুধু সাংবাদিকতাটা ছাড়া।

৪.

মফস্বলের অবস্থা তো আরও করুণ। এখানে পেশাদারত্বের মুখোশ পরা মালিক-সম্পাদকেরা বেতনের নামে যা দেন, খাতায় লিখিয়ে নেন তার থেকে কয়েক গুণ বেশি। কিছু না পাওয়া সাংবাদিকেরা ওই বেশি অংকে স্বাক্ষর করতে করতে এক সময় বিশ্বাসই করে নেন যে, এটাই তিনি পান! সেই বাস্তবতাকে ক্যাশ করতে তিনি তখন নিজের লেবাসকে ব্যবহার করেন। মুখে ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার’ উচ্চারণে ‘দীপ্ত পদক্ষেপে’ তিনি হামলে পড়েন নানা ‘আখড়ায়’। চষে বেড়ান জনপদ থেকে জনপদে। লক্ষ্য একটাই—রোজগারের হাত পাকানো! এসব কাজে একেকজন এমনই ‘ক্ষমতাবান’ আর ‘দক্ষ’ সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন যে, বেতন নিয়ে কোনো চিন্তাই করতে হয় না। উল্টো বিভিন্ন ‘ক্ষেত্র’ থেকে তিনি যা ‘হাসিল’ করেন তার একটা বড় ভাগ হিসেবে দিয়ে দেন পত্রিকা মালিক/সম্পাদককে। একপর্যায়ে তার পরিচিতি হয়ে ওঠে মালিকের ‘থলেদার’।

৫.

এই কাজে সবাই খুব পারদর্শী তা-ও বলা যাবে না। পারদর্শিতা প্রদর্শনকারীদের সংখ্যাও খুব একটা বেশি না। তবে, তারা সংঘবদ্ধ এবং দাপুটে। মালিকের ফাই-ফরমায়েশ খাটতে খাটতে তারা এতটাই শক্তি অর্জন করেন যে, অন্যসব সাংবাদিকদেরকে তাদেরই পদানত হয়ে থাকতে হয়। মালিক-সম্পাদকেরাও চলতে থাকেন তাদের ইশারায়। যারা সাংবাদিকতাকে সত্যিকার অর্থেই মহান পেশা হিসেবে মনে করেন তারা এক সময় হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। সময় কিন্তু থেমে থাকে না। ‘মহান পেশা’র তকমা যেহেতু জুটেছে সেহেতু এটাকে ছাড়া যাবে না! অদৃশ্য একটা মায়াও আবার কাজ করে। ছাড়বো কি ছাড়বো না ভাবতে ভাবতে একটা সময় পুলক চ্যাটার্জি আর বিভুরঞ্জনদের কাতারে শামিল হওয়া ছাড়া কোনো পথ থাকে না!

৬.

পুলক চ্যাটার্জির যে বকেয়া সমকাল পরিশোধ করেছে, তা সময়মতো পেলে তিনি হয়তো আমাদের মাঝে বেঁচে থাকতেন। তার মৃত্যুর পর এই টাকা আর তেমন কিছু ম্যাটার করে না। হয়তো পরিবারের একটু উপকার হবে। তবে পুলক চ্যাটার্জির বিয়োগবেদনা তাতে কমবে না বরং বাড়িয়ে তুলবে। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের এই বাস্তবতা থেকে বের হওয়ার আপাতত কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না

সম্প্রতি একজন সহকর্মী ফেসবুক পোস্টে ঢাকার পত্রিকার ‘মফস্বল’ সাংবাদিককে’ ‘বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি’ বানানো নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। হক কথা। এটা এমন যে, ‘ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’। ঢাকার হাতেগোনা কয়েকটি মিডিয়া ছাড়া অধিকাংশ গণমাধ্যম থেকে জেলা-উপজেলা প্রতিনিধিরা তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। কিছু মিডিয়া হ্যান্ডসাম স্যালারি দিলেও অধিকাংশ মিডিয়া মালিক হচ্ছেন ‘গোঁসাই’। তারা নানা ছলছুতোয় জেলা-উপজেলা প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করেন। না পারলে সকাল-বিকেল পোশাক পরিবর্তনের মতো প্রতিনিধি পরিবর্তন করেন।

এক রাজধানী থেকে শুনছি হাজারো পত্রিকা বের হয়। মফস্বলের অনেক জেলা থেকে দশ বা তারও বেশি পত্রিকা বের হচ্ছে। সমাজের প্রতি, সমাজের মানুষ, দেশ, পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রতি এগুলোর বেশিরভাগেরই কোন প্রয়োজনীয়তা ও দায় না থাকাতে এরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারছে। এদের নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো ভূমিকাও দেখা যায় না। কয়েকশ’ ছাপানো পত্রিকা ৪৫-৫০ হাজার সার্কুলেশন দেখিয়ে প্রথম শ্রেণির মিডিয়া হিসেবে তালিকাভুক্ত হচ্ছে। এসবই হচ্ছে সরকারি লোকদের মাধ্যমে। সেখান থেকে যা কিছু সুবিধা আসছে তার সবই পকেটে পুরছেন মিডিয়া মালিক।

পুলক চ্যাটার্জি আর বিভুরঞ্জন সরকাররা (আমরা সবাই) সেখানে থেকে যাচ্ছেন ক্রীতদাসই। যাদের পরিণতি হচ্ছে পৃথিবী থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায়।
আফসোস! এদেশ থেকে নির্মল সেনরা বিদায় নিয়েছেন অনেক আগেই!!

৪ অক্টোবর ২০২৬, যশোর
লেখক: বার্তাপ্রধান, সুবর্ণভূমি

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)