যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পিছু হটেনি যশোর, ভেঙেছে স্বৈরাচারের প্রাচীর

সোহানুর রহমান

প্রকাশ : শনিবার, ২৪ অক্টোবর,২০২৬, ০১:০০ এ এম
পিছু হটেনি যশোর, ভেঙেছে স্বৈরাচারের প্রাচীর

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা এক চরম ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে এ দেশের আপামর জনসাধারণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মহাবিস্ফোরণ। রাজধানী ঢাকা যখন এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল, ঠিক তখনই ঢাকার বাইরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার খ্যাত যশোর জেলা হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। রোদে উত্তপ্ত আর বৃষ্টিতে ভেজা রাজপথে যশোরের ছাত্র-জনতা যে অভূতপূর্ব বীরত্ব, সম্প্রীতি এবং সাহসিকতার স্বাক্ষর রেখেছে, তা বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ফ্যাসিবাদের বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে যশোরের মানুষ প্রমাণ করেছে— অন্যায় ও জুলুমের কাছে এ অঞ্চলের মানুষ কখনো মাথা নত করতে জানে না।

পটভূমি: অধিকার আদায়ের লড়াই ও ক্ষোভের আগুন

কোটা সংস্কারের ন্যায়সঙ্গত দাবি নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, সরকারের চরম অহংকার, দমন-পীড়ন এবং নির্মমতার কারণে তা দ্রুতই এক দফার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যশোরে এই আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার সচেতনতা এবং ফ্যাসিবাদের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ থেকে।

জুলাইয়ের তীব্র দাবদাহের মধ্যেই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়, তখন সেই প্রতিবাদের আগুন এসে পৌঁছায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি), যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ (এমএম কলেজ), যশোর জিলা স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বুকে। স্বৈরাচারী সরকারের পেটোয়া বাহিনী ও দলীয় ক্যাডাররা যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হতে শুরু করে, তখন যশোরের আপামর জনতা আর ঘরে বসে থাকতে পারেনি।

রোদে উত্তপ্ত, বৃষ্টিতে ভেজা রাজপথ

যশোরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং আবেগঘন বৈশিষ্ট্য ছিল এর প্রকৃতি ও রাজপথের মেলবন্ধন। জুলাই মাসের আবহাওয়া এমনিতেই থাকে বৈরী। কখনো মাথার ওপর তীব্র তপ্ত রোদ, আবার পরক্ষণেই মুষলধারে বৃষ্টি। কিন্তু কোনো প্রতিকূল আবহাওয়াই আন্দোলনকারীদের দমাতে পারেনি।

যশোর শহরের পালবাড়ি, দড়াটানা, মণিহার মোড় এবং মুজিব সড়ক হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের মূল ক্ষেত্র। তীব্র রোদে যখন পিচঢালা রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠতো, শিক্ষার্থীরা তখনো স্লোগানে স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলতো। দুপুরের প্রখর রোদে শিক্ষার্থীদের তৃষ্ণা মেটাতে এগিয়ে আসতো সাধারণ রিকশাচালক, ভ্যানচালক কিংবা ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

আবার যখন হঠাৎ আকাশ ভেঙে মুষলধারে নামতো শ্রাবণের বৃষ্টি, তখন সেই বৃষ্টিতে ভিজেই চলতো মিছিল। বৃষ্টির পানি আর চোখের জল, কখনো কখনো বীর শহীদদের রক্তের ধারা মিশে একাকার হয়ে যেত যশোরের পিচঢালা কালো রাজপথে। ভেজা কাপড়ে, সিক্ত শরীরে, কিন্তু জ্বলন্ত চোখে শিক্ষার্থীরা যখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতো— ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ কিংবা ‘দফা একটা, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’—তখন পুরো শহর যেন এক অলৌকিক শক্তিতে কেঁপে উঠতো। রোদ আর বৃষ্টির এই রূপক যেন ছিল আন্দোলনের ভেতরের তীব্র ক্ষোভ ও আত্মত্যাগের এক পরম বহিঃপ্রকাশ।

সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ: অভূতপূর্ব জনস্রোত

যশোরে গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ও শক্তি ছিল এর সর্বজনীনতা। এটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠন বা রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার এবং মর্যাদা রক্ষার লড়াই।

শিক্ষার্থীদের অগ্রযাত্রা: স্কুল, কলেজ, মাদরাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছিল এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি। বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের রাজপথে নেমে আসা এবং তাদের সাহসী স্লোগান যশোরের সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে বের হতে বাধ্য করেছিল।

শ্রমজীবী মানুষের সংহতি: রিকশাচালক, দিনমজুর, ভ্যানচালক, কুলি এবং কলকারখানার শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে যোগ দেন। তারা কেবল মিছিলই করেননি, বরং পুলিশ ও দলীয় ক্যাডারদের হাত থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন।

পেশাজীবী ও শিক্ষকদের ভূমিকা: যশোরের প্রগতিশীল শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও সাংবাদিকরা সরাসরি শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ান। অনেক শিক্ষক নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশি অ্যাকশনের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের আড়াল করেছেন।

নারীদের অংশগ্রহণ: গৃহিণীরা ঘরের কোণ ছেড়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। অনেক মা মিছিলে আসা অচেনা শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো করে পানি, বিস্কুট বা স্যালাইন খাইয়ে দিয়েছেন। স্বৈরাচারের বুলেটের তোয়াক্কা না করে নারীদের এই অংশগ্রহণ ফ্যাসিবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সম্প্রীতির এক অনন্য মেলবন্ধন

ফ্যাসিবাদী শক্তি সবসময় সমাজকে বিভক্ত করে শাসন করতে চায়। তারা ধর্ম, বর্ণ, দল ও মতের বিভাজন তৈরি করে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু যশোরের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল এই বিভাজনের রাজনীতির মুখে এক চরম চপেটাঘাত। এটি ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সম্প্রীতির এক অনুপম মেলবন্ধন।

আন্দোলনের দিনগুলোতে যশোরে কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিভেদ ছিল না। যখন মুসলিম শিক্ষার্থীরা রাজপথে জোহরের নামাজ আদায় করতেন, তখন সনাতন ধর্মাবলম্বী কিংবা অন্যান্য ধর্মের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ তাদের চারপাশ কর্ডন করে পাহারা দিতেন, যেন পুলিশ বা সন্ত্রাসী বাহিনী মোনাজাত বা নামাজের ওপর হামলা করতে না পারে।

একইভাবে, শহরের বিভিন্ন মোড়ে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সবাই এক পাত্র থেকে পানি পান করেছেন, একই খাবার ভাগ করে খেয়েছেন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্লোগান দিয়েছেন। এই সম্প্রীতি কেবল আন্দোলনের মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না; স্বৈরাচারের পতনের পর যখন একটি গোষ্ঠী দেশে বিশৃঙ্খলা ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার অপচেষ্টা করেছিল, তখন এই সম্প্রীতির মেলবন্ধন আরও দৃঢ় রূপ নেয়। যশোরের সাধারণ ছাত্র-জনতা রাত জেগে মন্দির, গির্জা এবং সরকারি সম্পদ পাহারা দিয়ে প্রমাণ করে, এই অভ্যুত্থান ধ্বংসের জন্য নয়, বরং একটি বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সংঘটিত হয়েছিল।

দমন-পীড়ন, রক্তপাত ও বীরত্বগাথা

ফ্যাসিবাদী সরকার সহজে ক্ষমতা ছাড়তে চায়নি। যশোরের রাজপথও রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। স্বৈরাচারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী এবং দলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা নির্বিচারে গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করে।

যশোরের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর ছাদ থেকে ইটপাটকেল ও গুলি ছোড়া হয়। বহু শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ছররা গুলিতে অন্ধ হয়েছেন, চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। কিন্তু যতই রক্ত ঝরেছে, যশোরের মানুষের প্রতিরোধের দেয়াল ততই শক্ত হয়েছে। একজন আন্দোলনকারী পড়ে গেলে, তার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে আরও দশজন। শহীদদের রক্তের কসম খেয়ে মানুষ রাজপথ না ছাড়ার শপথ নিয়েছিল। সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে যশোর জেনারেল হাসপাতাল প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছিল এক কান্নার সাগরে, যেখানে ডাক্তার-নার্স থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ আহতদের বাঁচাতে সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছেন।

ফ্যাসিবাদের পতন ও বিজয়ের নতুন সকাল

দীর্ঘ লড়াই, আত্মত্যাগ এবং বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের পর আসে সেই ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় মার্চের মুখে অবশেষে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসক। এই খবর যখন যশোরে পৌঁছায়, তখন রোদ-বৃষ্টিতে উত্তপ্ত ও সিক্ত রাজপথ এক মুহূর্তে রূপ নেয় আনন্দের জনসমুদ্রে।

মানুষের চোখে তখন স্বস্তি ও বিজয়ের আনন্দাশ্রু। যে রাজপথে কয়েক ঘণ্টা আগেও ছিল বুলেটের শব্দ আর কান্নার আওয়াজ, সেখানে মুখরিত হয়ে ওঠে বিজয়ের উল্লাস। যশোরের মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশের আনন্দ ভাগ করে নেয়। তবে এই বিজয় কেবল উদযাপনের ছিল না, এটি ছিল দায়িত্বের। বিজয়ের পরপরই যশোরের শিক্ষার্থীরা শহরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা পরিষ্কার এবং দেয়ালচিত্রের মাধ্যমে এক নতুন, নান্দনিক ও সুশৃঙ্খল যশোর গড়ার কাজে নেমে পড়ে।

শেষ কথা

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং তা এ দেশের তরুণ সমাজের অসীম সম্ভাবনা ও সাধারণ মানুষের শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। রোদ আর বৃষ্টিতে ভেজা যশোরের সেই উত্তপ্ত রাজপথ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হয়। সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সেই সম্প্রীতির মেলবন্ধন আজ আমাদের নতুন বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক।

যশোরের মাটিতে যে তরুণেরা রক্ত দিয়েছেন, যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে স্বৈরাচারের বুলেটকে স্তব্ধ করে দিয়েছেন, তাদের এই আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে নতুন স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছে, তার চেতনা ধরে রেখে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের আজকের প্রধান অঙ্গীকার। জুলাইয়ের চেতনা অমর হোক, অক্ষুণ্ন থাকুক ছাত্র-জনতার এই ঐতিহাসিক সম্প্রীতি।

লেখক: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)