সম্পাদকীয়
ডেঙ্গু এখন আর নিছক মৌসুমি রোগ নয়; বরং বছরজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য এক গুরুতর চ্যালেঞ্জ। যশোরে ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান প্রকোপ সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় এক হাজার ৯৬৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০০ জন। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন পরিকল্পিত, ধারাবাহিক ও সমন্বিত কর্মসূচি।
যশোর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যায় অভয়নগর ও যশোর সদর উপজেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো। আলোচ্য সময়কালে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭২৮ জন এবং যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৪০১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ পরিসংখ্যান শুধু রোগের বিস্তারের চিত্র তুলে ধরে না, বরং সংশ্লিষ্ট এলাকায় মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও নির্দেশ করে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রথম দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের। তবে শুধু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ড্রাম ও বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। বিশেষ করে সপ্তাহে অন্তত একবার এসব স্থান পরিদর্শন ও পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
শুধু প্রচার-প্রচারণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রতিরোধ কার্যক্রমের বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত মশার প্রজননস্থল পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা, প্রয়োগপদ্ধতি এবং কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
অন্যদিকে, আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, চিকিৎসাসামগ্রী ও জনবলের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকতে হবে। চিকিৎসাসেবা যেন কোনোভাবেই বিলম্বিত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ, বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ ব্যথানাশক ব্যবহার, পরিহার করা প্রয়োজন।
এডিস মশা মূলত দিনের বেলায় কামড়ায়। তাই শুধু রাতে নয়, দিনেও মশারি ব্যবহার, শরীর ঢাকা পোশাক পরা এবং মশা নিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে ডেঙ্গু সম্পর্কে ভুল তথ্য ও অপচিকিৎসার বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
যশোরে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনের উদ্যোগ, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং নাগরিকদের সচেতনতা—এই তিনের সমন্বয়েই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। আতঙ্ক নয়, চাই দায়িত্বশীলতা; সাময়িক তৎপরতা নয়, চাই সারা বছর ধরে প্রতিরোধ কার্যক্রম। ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব সবার। সম্মিলিত উদ্যোগই পারে যশোরকে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে।