যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

ইতিহাসের স্মারকে আঘাত: কার্যকর ব্যবস্থা নিন

প্রকাশ : বুধবার, ৪ নভেম্বর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
ইতিহাসের স্মারকে আঘাত: কার্যকর ব্যবস্থা নিন

যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে গভীর রাতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা শুধু একটি স্থাপনায় নাশকতা নয়, এটি আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাস, গণমানুষের আত্মত্যাগ এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রক্ত, ত্যাগ ও সংগ্রামের স্মারক এই স্তম্ভে আগুন দেওয়ার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানের একটিতে এমন ঘটনা ঘটলো কীভাবে?

সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রোববার গভীর রাতে মোটরসাইকেলে আসা তিন যুবক মাত্র এক মিনিটের মধ্যে স্মৃতিস্তম্ভের দক্ষিণ পাশে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায়। অথচ সেখানে ২৪ ঘণ্টা পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা থাকার কথা। ঘটনাস্থলের কাছেই পুলিশ বক্স, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়। এমন একটি সুরক্ষিত এলাকায় দুর্বৃত্তদের নির্বিঘ্নে অগ্নিসংযোগ করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কেবল দুজন সদস্যকে বরখাস্ত করেই কি দায়িত্ব শেষ হবে? এই ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, কী উদ্দেশ্যে তারা এমন নাশকতা চালিয়েছে এবং তাদের পরিকল্পনা ও সহযোগিতার পরিধি কতটুকু—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্বলতাও চিহ্নিত করা জরুরি।

ঘটনার পর স্মৃতিস্তম্ভ সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়ার দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রচার করা হয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগের কয়েক নেতার ফেসবুক ওয়ালে। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে নিষিদ্ধ সংগঠনটির নেতারা এই সাহস পায় কোথায়? আসলে পুলিশের দুর্বলতার কারণে এমনটি ঘটছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। এর আগেও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড একই ব্যক্তিদের লাইভ প্রচার করতে দেখা গেছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সম্পত্তি নয়। এটি ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ইতিহাস। এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ, আহত মানুষের যন্ত্রণা এবং অসংখ্য পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী বেদনা। ফলে জুলাইয়ের স্মৃতিস্তম্ভে অগ্নিসংযোগকে নিছক বিচ্ছিন্ন দুষ্কর্ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি অসম্মানজনক আঘাত।

তবে এই ঘটনার প্রতিবাদ হতে হবে গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত পথে। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, রাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা প্রতিশোধের রাজনীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগের।

আমরা মনে করি, যশোরের জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কার্যকর নজরদারি, সিসিটিভি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার অভিযানের প্রতিটি ধাপেও আইনি স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।

জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ শুধু ইট-পাথর কিংবা কংক্রিটের স্থাপনা নয়; এটি একটি জাতির আত্মত্যাগ, প্রতিবাদ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আগুনের কালো দাগ মুছে ফেলা সম্ভব, কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা মুছে ফেলা যায় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু স্মৃতিস্তম্ভ রক্ষা করা নয়, যে মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে এটি দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোকেও সমুন্নত রাখা।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)