যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

আমার সহোদর কমরেড দীপু

আবুল বাশার সাইফুদ্দৌলা

প্রকাশ : বুধবার, ৪ নভেম্বর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
আমার সহোদর কমরেড দীপু

শহীদ কমরেড আবুবকর জাফরুদ্দৌলা দীপু পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর গ্রামে ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময়ে কায়ুর কমরেডদের নেতার নাম ছিল আবুবকর। কমরেড দীপুর পিতা প্রয়াত আব্দুল হাসিব ব্রিটিশবিরোধী কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং তার সন্তানও সেই আদর্শ ধারণ করে বড় হবে—সেই চিন্তা করে ছেলের নাম রেখেছিলেন আবু বকর। সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিজেকে উৎসর্গ করে শহীদ কমরেড দীপু তার নামের সার্থকতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

শহীদ কমরেড দীপুর পিতা প্রয়াত আব্দুল হাসিব ছিলেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার অধিকারী একজন ব্যক্তি। যিনি অবিভক্ত কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পেশাগত জীবনে প্রথমে তিনি খাদ্য অধিদপ্তরে এবং পরবর্তীতে বীমা কোম্পানিতে একজন সফল কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকতা পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। সর্বশেষ তিনি দৈনিক লোকসমাজের সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। আব্দুল হাসিবের নয় সন্তানের মধ্যে দীপু ছিলেন দ্বিতীয়। বড় বােন অধ্যাপক নার্গিস বেগম বর্তমানে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন।

দীপুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় সাতক্ষীরা শহরের জুবিলী প্রাইমারি স্কুল থেকে। সেখান থেকে পেশাগত কারণে পিতা আব্দুল হাসিব যশোরে চলে এলে দীপু ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী যশোর সম্মিলনী ইন্সটিটিউশনে। সেখানে অধ্যয়নকালে ১৯৫৮ সালে আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্রচণ্ড রূপ পেলে দীপু ছাত্র রাজনীতির প্রতি ঝুঁকে পড়েন। পড়াশোনার পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে থাকেন। ১৯৬৪ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাশ করে যশোর এমএম কলেজে ভর্তি হন। এমএম কলেজ থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে আইএসসি ও বিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এমএম কলেজে পড়া অবস্থায় তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) একজন সক্রিয় কর্মী হিসাবে সংগঠনের প্রতিটা কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। তার এ সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকান্ডের প্রেরণার উৎসস্থল ছিল তার বড় বোন নার্গিস বেগম; যিনি সে সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) যশোর জেলার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। ৬৮-৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতিটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইয়ুববিরোধী প্রচণ্ড ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। এমন সময়ে তৎকালীন সরকারি ছাত্র সংগঠনের ছত্রছায়ায় এমএম কলেজে আইয়ুব খানের ‘উন্নয়নের এক দশক’ পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে যে ছাত্র-আন্দোলন হয় সেখানেও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন দীপু। ছাত্র রাজনীতি করা অবস্থাতেই কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যোগাযোগ হয় দীপুর। ধীরে ধীরে কমরেড আসাদ, নজরুল, হাফিজ, মানিকের মতো তিনিও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।

১৯৭০ সালে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে যান এবং কমিউনিস্ট পার্টির গোপন রাজনীতির সাথে নিজেকে পুরোপুরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ যশোর কারাগার ভেঙে কমরেড অমল সেন, বৈদ্যনাথ বিশ্বাস, অ্যাডভোকেট সৈয়দ গোলাম মোস্তফা, গোকুল বিশ্বাসকে মুক্ত করার সময় শহরের পার্টি কমরেডদের মধ্যে মহিউদ্দিন আলী আখতার, মতিন মুনির, নূর মোহাম্মদ, আসাদ, নজরুল, শান্তির সাথে দীপুও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে জুলাই মাসে কমরেড নূর মোহাম্মদের সাথে দীপু পার্টির হেড কোয়ার্টার শালিখার পুলুম গ্রামে চলে যান। ১৯৭১ সালে ১৩ অক্টোবরে নড়াইলে পাক বাহিনী ও রাজাকাররা নলদি বাজারে নেমে দ্রুতগতিতে আক্রমণ করে। ওই সময় যশোবন্তপুরে সম্মুখযুদ্ধে নয় পাক সেনা মারা যায়। এ যুদ্ধে কমরেড পন্টু শহীদ হন। কমরেড দীপু পাক বাহিনীর আক্রমণে কোনোরকমে বেঁচে যান। ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (ইপিসিপিএমএল) ২৩ অক্টোবর ১৯৭১ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অস্ত্রধারী বাহিনী বিলুপ্ত ঘোষণা করে। ওই সময় দীপু ‘বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে’ বলে সব কমরেডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নড়াইল জেলার খলিসাখালী গ্রামে চলে যান। পরবর্তীতে নলদীচর গ্রামে তিনি এক বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখান তিনি বাঘারপাড়ার বাড়ী গ্রামে অবস্থান নেন।

রাজনীতির পাশাপাশি কমরেড দীপু প্রচুর পড়াশুনা ও লেখালেখি করতেন। তিনি ‘প্রাথমিক রাজনীতি’ নামে একটি বই লিখে গেছেন। সেটা ১৯৭৭ সালে সাপ্তাহিক গণশক্তিতে ছাপা হয়েছিলো। এছাড়া মার্কসীয় দর্শনের ওপর তিনি বেশকিছু প্রবন্ধ/নিবন্ধ লিখে গেছেন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন পাক বাহিনী পূর্ব-বাংলার নিরস্ত্র জনগণের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়, সেসময় সর্বপ্রথম কমরেড দীপুর মতো অকুতোভয় সূর্যসেনারাই আমজনতার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে এ সমস্ত সূর্যসন্তানের মধ্যে কমরেড আসাদ, মানিক, শান্তি, তোজো, ফজলু, ইসহাক, নজরুল, হাফিজ, হেমসহ অসংখ্য কমিউনিস্ট নেতা-কর্মী সদস্য শহীদ হন।

১৯৭১ পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মধ্যে তৎকালীন মুজিব সরকারের জাতীয় রক্ষী বাহিনীর হাতে কমরেড সিরাজ শিকদারসহ ৩৪ হাজার বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যা-গুমের শিকার হন। কমরেড দীপু তার মধ্যে একজন। ১ নভেম্বর ১৯৭৪ সালে কমরেড দীপু ঢাকা রোড ব্রিজের কাছ থেকে কালীগঞ্জ অভিমুখী বাসে যাত্রা করেন। ১৯৭৪ সালের ৪ নভেম্বর দীপু তার কয়েক সহযোদ্ধাসহ কোটচাঁদপুরে পুষ্পবলরমপুর গ্রামে পার্টি নির্ধারিত স্থানে সভা করার জন্য উপস্থিত হলে রক্ষী বাহিনী সেখানে অতর্কিত হামলা চালায়।

সেখানে উপস্থিত দীপু (গোপন নাম গোরা), রাশিদা (গোপন নাম ঝরনা), মহিউদ্দিন বিশ্বাস (গোপন নাম আলো), হায়দার আলী গাজী ও তবিবর গ্রেপ্তার হন। কমরেড তবিবর ছাড়া সবাইকে হত্যা ও গুম করা হয়। গ্রেপ্তারের পরে পথিমধ্যে কমরেড তবিবর বাঁওড়ে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। উল্লেখ্য, কমরেড মহিউদ্দিন ও কমরেড ঝরনা ছিলেন আপন ভাই-বোন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পরে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যখন কমিউনিস্ট আন্দোলনকে নতুন করে বিনির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে, তখনই কমরেড দীপু শহীদ হন। বিরাট বিপর্যয়ের পর নিজ মেধা ও যোগ্যতায় দীপু তদানীন্তন ইপিসিপি (এম-এল) এর বৃহত্তর যশোর জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। শহীদ দীপুর স্বপ্ন ছিল সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা। দীপুর আত্মত্যাগ সেদিনই সার্থকতা লাভ করবে, যেদিন তার স্বপ্ন এদেশে বাস্তবায়িত হবে।

লেখক: শহীদ কমরেড আবুবকর জাফরুদ্দৌলা দীপুর ভাই

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)