যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

তরিকুল ইসলাম: রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ

তসলিম শিমুল

প্রকাশ : বুধবার, ৪ নভেম্বর,২০২৬, ১২:৩০ এ এম
তরিকুল ইসলাম: রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ

তরিকুল ইসলাম: রাজনীতির দীর্ঘ পথের এক অধ্যায়ের নাম

তরিকুল ইসলাম: রাজনীতির দীর্ঘ পথের এক অধ্যায়ের নাম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মানুষ কেবল একটি দল, একটি পদ কিংবা একটি নির্বাচনি এলাকার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেন না। তাদের রাজনৈতিক জীবন হয়ে ওঠে একটি সময়ের দলিল। মরহুম তরিকুল ইসলাম তেমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—যার দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যশোরের রাজনীতি, দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং জাতীয় রাজনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোরে জন্ম নেওয়া তরিকুল ইসলামের রাজনীতিতে প্রবেশ ছাত্রজীবনেই। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি বামপন্থি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি তৎকালীন স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনেও তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯৬২ সালে যশোরের মাইকেল মধুসূদন কলেজের শহীদ মিনার সংস্কারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হওয়া তার রাজনৈতিক সক্রিয়তারই প্রাথমিক নিদর্শন।

আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তাকে ধীরে ধীরে বৃহত্তর জাতীয় রাজনীতির দিকে নিয়ে যায়। ১৯৭০ সালে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। অর্থাৎ তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, ক্ষমতার রাজনীতির ভেতর দিয়ে নয়।

স্বাধীনতার পর তার রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন আসে। জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি যশোরের স্থানীয় রাজনীতিতে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। ১৯৭৩ সালে যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৭৮ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া ছিল সেই উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। একই বছর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিতে যোগ দিয়ে তিনি দলটির প্রাথমিক সাংগঠনিক বিকাশে যুক্ত হন। যশোরে বিএনপির সংগঠন বিস্তারে তার ভূমিকা পরবর্তী সময়ে তাকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সারিতে নিয়ে আসে।

১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার জাতীয় সংসদীয় রাজনীতির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে যশোর থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। সমাজকল্যাণ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ; খাদ্য; তথ্য; পরিবেশ ও বনসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন তার রাজনৈতিক জীবনের পরিধি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ব্যাপ্তি তুলে ধরে।

তবে তরিকুল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক সম্ভবত তার দীর্ঘ সাংগঠনিক পথচলা। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের পর ২০০৯ সালে তিনি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি এই নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্য ছিলেন।

একজন রাজনীতিককে মূল্যায়ন করতে গেলে শুধু তার পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতায় থাকার সময় দিয়ে বিচার করলে রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। তরিকুল ইসলামের ক্ষেত্রেও তাই। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছিল আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে; স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ, সংসদ থেকে মন্ত্রিসভা, আর সেখান থেকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়—এই দীর্ঘ যাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তনশীল চরিত্রেরও একটি প্রতিচ্ছবি।
অবশ্য তার রাজনৈতিক জীবন বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল—এমন দাবি ইতিহাসসম্মত হবে না। যে কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মতো তার ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক

মহলে নানা মূল্যায়ন ও মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে যে সময়গুলোতে তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন, সেসব সময়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মেই এসব মূল্যায়ন ভবিষ্যতে আরও হবে।

কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই—যশোরের রাজনীতিতে তরিকুল ইসলাম ছিলেন দীর্ঘদিনের একটি দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী নাম। তার রাজনৈতিক সক্রিয়তার সময়কাল এত দীর্ঘ যে, কয়েক প্রজন্মের যশোরবাসী তাকে রাজনীতির মাঠে দেখেছেন। স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসা একজন নেতার এই দীর্ঘ উপস্থিতি তাকে যশোরের রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে।

২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একজন প্রবীণ রাজনীতিকের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু একজন রাজনীতিকের মৃত্যু তার রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটায় না; বরং শুরু হয় নতুন করে মূল্যায়নের সময়। তার সিদ্ধান্ত, সাফল্য, সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক অবস্থান ও সময়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক— সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় ইতিহাসের বিচার।

তরিকুল ইসলাম চলে গেছেন, কিন্তু তার রাজনৈতিক পথচলার ছাপ রয়ে গেছে যশোরের রাজনীতিতে এবং বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার জীবন হয়তো কোনো একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসরণমাত্র নয়; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার একটি অধ্যয়ন—যেখানে ছাত্ররাজনীতি, আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্থানীয় সরকার, সংসদীয় রাজনীতি, মন্ত্রিত্ব এবং দলীয় নেতৃত্ব একই জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে এসে মিলেছে।

রাজনীতির মানুষকে শেষ পর্যন্ত সময়ই বিচার করে। তরিকুল ইসলামের ক্ষেত্রেও সেই বিচার চলবে তথ্য, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে। আর যশোরের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার নাম নিঃসন্দেহে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের শিরোনাম হয়ে থাকবে।

লেখক: পেশাজীবী

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)