সোবহান নিপুণ
মাদরাসা আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লাখ লাখ শিশু এখানে কোরআন, হাদিস ও ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি বিভিন্ন স্তরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করে। অনেক পরিবার বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা থেকে সন্তানকে মাদরাসায় পাঠায়। বিশেষ করে আবাসিক ও হিফজ মাদরাসাগুলোতে অভিভাবকের কাছ থেকে দূরে এসে শিশুরা দিনের বড় একটি সময় শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে থাকে। সেই জায়গাটিই যখন শিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্নটি শুধু একটি অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে আমাদের প্রতিষ্ঠান, তদারকি ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে।
সম্প্রতি ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ১৩ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগের পর মামলা হয়েছে এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এর আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। সেপ্টেম্বরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে এক শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে এক শিক্ষক ও মাদরাসার পরিচালককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেখানে দুই শতাধিক শিশু আবাসিকভাবে পড়াশোনা করতো বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে।
নওগাঁর ধামইরহাটে দশ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে একজন শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল চলতি বছরের মে মাসে। জুনে নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় ১২ বছর বয়সী এক ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে আরেক মাদরাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
এসব ঘটনা কোনোভাবেই প্রমাণ করে না যে, মাদরাসা মানেই শিশুদের জন্য অনিরাপদ। বরং এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে কোনো আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিশু সুরক্ষার শক্তিশালী ব্যবস্থা না থাকলে ক্ষমতার অসম সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে অপরাধ ঘটতে পারে।
জাতিসংঘ শিশু তহবিলও (ইউনিসেফ) বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে এবং স্কুল, মাদরাসা, কর্মক্ষেত্র ও অন্যান্য শিশু-সেবা প্রতিষ্ঠানে আরও শক্তিশালী জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
সমস্যাটা কোথায়
একজন শিক্ষক যদি একটি শিশুকে একান্তে একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে ভয় দেখাতে পারেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন করতে পারেন কিংবা শিশু অভিযোগ করার পরও প্রতিষ্ঠান বিষয়টি গোপন রাখে, তাহলে শুধু ওই ব্যক্তির অপরাধ দেখলে পুরো সমস্যাটি বোঝা যাবে না।
* দেখতে হবে প্রতিষ্ঠানের কাঠামো কেমন;
* শিক্ষক নিয়োগের সময় তার পূর্ববর্তী কর্মস্থল, আচরণ, পরিচয় ও অপরাধের ইতিহাস যাচাই করা হয় কি না;
* আবাসিক মাদরাসায় শিশুদের সঙ্গে শিক্ষক বা কর্মচারীদের একান্তে থাকার সুযোগ কতটা আছে;
* শিশুরা কোনো অভিযোগ করলে সে কোথায় যাবে;
* অভিযোগ করার পর প্রতিষ্ঠান সেটি তদন্ত করবে, নাকি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করবে;
* অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয় কি না;
* শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে কেউ সেটি লক্ষ্য করেন কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে একটি ঘটনা নিয়ে কয়েক দিন আলোচনা হবে, কয়েকজন গ্রেপ্তার হবে, তারপর আবার একই ধরনের ঘটনা সামনে আসবে।
মাদরাসা শিক্ষা সংস্কার মানে ধর্মীয় শিক্ষা বাদ দেওয়া নয়
এখানে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার হওয়া দরকার। মাদরাসা শিক্ষার সংস্কার নিয়ে কথা বলা মানে ধর্মীয় শিক্ষার বিরোধিতা করা নয়। বরং ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক শিশু সুরক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ, বিজ্ঞানমনস্কতা, নাগরিক শিক্ষা এবং নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা যুক্ত করাই হওয়া উচিত সংস্কারের লক্ষ্য। বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বর্তমানে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা রয়েছে। দাখিল ও আলিম পর্যায়ের বেসরকারি মাদরাসা স্থাপন, পাঠদান ও অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি এবং গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি নিয়েও নতুন নীতিমালা/প্রবিধানমালা রয়েছে। অর্থাৎ কাঠামো একেবারে নেই, বিষয়টি এমন নয়। বড় প্রশ্ন হলো, নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগ কতটা হচ্ছে এবং নজরদারি কতটা কার্যকর।
তাহলে কী করা যেতে পারে
প্রথমত, প্রতিটি আবাসিক মাদরাসায় বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা থাকতে হবে। শিশুর প্রতি শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন কী, শিশুর কাছ থেকে কী ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগের সীমা কী হবে এবং অভিযোগ হলে কী প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা লিখিতভাবে থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি মাদরাসায় স্বাধীন ‘শিশু সুরক্ষা কমিটি’ থাকতে হবে। শুধু প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বা শিক্ষক দিয়ে এই কমিটি করলে চলবে না। সেখানে অভিভাবক প্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন/সামাজিক সেবা ব্যবস্থার প্রতিনিধি এবং প্রয়োজনে শিশু সুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষিত ব্যক্তি থাকতে পারেন। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ২০১৯ সালেই অধিভুক্ত সব মাদরাসায় ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ গঠনের নির্দেশনা দিয়েছিল। এখন প্রয়োজন সেই নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়ন ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
তৃতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগে পূর্ববর্তী রেকর্ড বিবেচনায় নেওয়া বাধ্যতামূলক করা দরকার। কোনো ব্যক্তি আগে কোথাও শিশু নির্যাতন, যৌন হয়রানি বা গুরুতর সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন কি না, তা যাচাই না করে তাকে আবাসিক শিশুদের দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়।
চতুর্থত, আবাসিক মাদরাসায় শিশুদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ করার জন্য শুধু মোহতামিম বা শিক্ষককে দায়িত্ব দিলে হবে না। শিশুকে এমন একজন নিরপেক্ষ ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে, যার কাছে অভিযোগ করলেও সে ভয় পাবে না।
পঞ্চমত, সিসিটিভি থাকতে পারে, কিন্তু শিশুর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। প্রবেশপথ, করিডোর, সিঁড়ি, সাধারণ আবাসিক এলাকা ও অন্যান্য উপযুক্ত স্থানে ক্যামেরা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারে। কিন্তু বাথরুম, টয়লেট, পোশাক পরিবর্তনের জায়গা বা শিশুর ব্যক্তিগত পরিসরে কোনোভাবেই ক্যামেরা বসানো যাবে না। সম্প্রতি মাদরাসাগুলোতে শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে পাঠানো একটি আইনি নোটিসেও এমন কাঠামোগত ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ষষ্ঠত, শিশুদের বয়স উপযোগী নিজেকে সুরক্ষিত রাখার শিক্ষা দিতে হবে। শিশুকে শেখাতে হবে:
* কেউ অনুচিতভাবে শরীর স্পর্শ করলে কী করতে হবে;
* কেউ ভয় দেখালে কার কাছে বলতে হবে;
* কেউ ‘এটা কাউকে বলবে না’ বললে কীভাবে সাহায্য চাইতে হবে;
* শিক্ষক, বড় ভাই কিংবা পরিচিত মানুষ হলেও অনিরাপদ আচরণ হলে তা জানানো অপরাধ নয়।
এ ধরনের শিক্ষা শিশুকে ধর্ম থেকে দূরে সরায় না; বরং নিজের মর্যাদা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করে।
সপ্তমত, অভিযোগ পাওয়ার পর মাদরাসার কথিত সম্মান রক্ষার নামে ঘটনা চাপা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানের সম্মান কোনো শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে না। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি তদন্ত করবে আইনগতভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। প্রতিষ্ঠান নিজেরাই বিচারক হয়ে অভিযোগকারী শিশুকে চুপ করিয়ে দিলে সেটি আরও বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
অষ্টমত, অভিযুক্তকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগী শিশুর চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
যৌন নির্যাতনের পর শিশুর শরীরে যেমন ক্ষতি হতে পারে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি ভয়, অপরাধবোধ, লজ্জা, বিষণ্নতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকিও থাকে। তাই মামলা করেই রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিশু আইন, ২০১৩-তেও যৌন নির্যাতন বা হয়রানির শিকার শিশুকে বিশেষ সুরক্ষা ও যত্নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছে।
মাদরাসা ব্যবস্থার আরও বড় সংস্কার দরকার
শুধু শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ করলেই মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার সব সমস্যা সমাধান হবে না। মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, নাগরিক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার বিষয়ে শিক্ষার মান আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
শিক্ষকদেরও নিয়মিত প্রশিক্ষণ দরকার। শুধু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকতা নয়, শিশুদের মনোগঠন, শৃঙ্খলা, সুরক্ষা, লিঙ্গ সংবেশনশীল শ্রেণি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা উচিত। শিশুকে ভয় দেখিয়ে, মারধর করে বা অপমান করে ভালো মানুষ বানানো যায় না। ভালো মানুষ তৈরি হয় জ্ঞান, মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, আত্মমর্যাদা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে।
শেষ কথা
মাদরাসার শিক্ষক মানেই অপরাধী নন। একইভাবে সাধারণ স্কুলের শিক্ষকও সবাই নিষ্কলুষ নন। অপরাধীর কোনো ধর্ম, পোশাক বা পেশা নেই। তাই মাদরাসায় কোনো শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যেমন অন্যায়, তেমনি ‘এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াও দায়িত্বহীনতা। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে শিশু মাদরাসায় যাবে ধর্মীয় জ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষা অর্জন করতে, ফিরে আসবে নিরাপদ, আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে। মাদরাসার দরজা শুধু জ্ঞানের দরজা নয়, সেখানে অভিভাবকের বিশ্বাসও জমা থাকে। সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় আমানত হলো একটি শিশু। তাই প্রশ্নটি মাদরাসা বনাম সাধারণ শিক্ষা নয়। প্রশ্নটি হলো—আমরা কি আমাদের প্রতিটি শিশুর জন্য সত্যিই নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে প্রস্তুত? উত্তরটি শুধু বক্তৃতায় নয়, নীতিমালা, তদারকি, শিক্ষক নিয়োগ, অভিযোগ ব্যবস্থা এবং জবাবদিহির বাস্তব প্রয়োগে দিতে হবে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট