সম্পাদকীয়
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় সমাবর্তন। দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, সংগ্রাম, ত্যাগ ও সাধনার স্বীকৃতি হিসেবে একজন শিক্ষার্থীর কাছে সমাবর্তনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ গ্রহণের আয়োজন নয়; বরং শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি এবং নতুন জীবনে পদার্পণের উদযাপন। তাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) পঞ্চম সমাবর্তন ঘিরে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রত্যাশা ও উচ্ছ্বাস থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমাবর্তনের নিবন্ধন ও সনদ ফির সম্ভাব্য পরিমাণ প্রকাশ্যে আসার পর সেই উচ্ছ্বাসের জায়গায় অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ইবির পঞ্চম সমাবর্তনে অংশগ্রহণের জন্য প্রাথমিকভাবে সমাবর্তন ফি পাঁচ হাজার এবং সনদ ফি এক হাজার টাকা নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীকে অংশগ্রহণের জন্য মোট ছয় হাজার টাকা ব্যয় করতে হতে পারে। অথচ সমাবর্তনে অংশ নিতে আগ্রহী অনেক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে অনার্স ও মাস্টার্সের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করেছেন। সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন করে ছয় হাজার টাকা জোগাড় করা মোটেও সহজ নয়। ফলে এই ফি নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
সমাবর্তন আয়োজন নিঃসন্দেহে ব্যয়বহুল একটি কর্মযজ্ঞ। প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ, প্যান্ডেল নির্মাণ, সার্বিক সাজসজ্জা, নিরাপত্তা, আপ্যায়ন, পরিবহন, সনদ মুদ্রণসহ নানা খাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে প্রত্যাশিত অর্থ না পাওয়া এবং পর্যাপ্ত স্পনসর সংগ্রহে সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু আয়োজনের ব্যয়ভার মেটানোর প্রধান উপায় হিসেবে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশেষ করে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন আয়োজনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আর্থিক সামর্থ্য ও বাস্তব পরিস্থিতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নির্ধারিত ফি কোন কোন খাতে ব্যয় হবে এবং এর হিসাব কতটা স্বচ্ছ? প্রতিটি খাতের সম্ভাব্য ব্যয়, শিক্ষার্থীপ্রতি খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বরাদ্দ এবং স্পনসর থেকে প্রাপ্ত অর্থের হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীদের আস্থা বাড়বে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে ফি নির্ধারণের যে প্রস্তাব এসেছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন ফি ও আয়োজনের ব্যয়ের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, করপোরেট স্পনসরশিপ এবং অন্যান্য বৈধ অর্থায়নের পথ অনুসন্ধান করতে হবে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছাড় কিংবা কিস্তিতে ফি পরিশোধের সুযোগ রাখা যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মনে রাখা প্রয়োজন, সমাবর্তনের সফলতা কেবল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের ওপর নির্ভর করে না; বরং কত বেশি শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নিতে পারলেন, সেটিও সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। গুণগত মান বজায় রাখার নামে এমন ব্যয় নির্ধারণ করা উচিত নয়, যা অনেক শিক্ষার্থীকে নিজেদের দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত আয়োজন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
আমরা আশা করি, ইবি প্রশাসন চূড়ান্ত বাজেট প্রণয়নের আগে শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মতামত গ্রহণ করবে। ফি নির্ধারণে স্বচ্ছতা, যৌক্তিকতা ও শিক্ষার্থীবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করবে। সমাবর্তন হোক অর্জনের আনন্দ, স্মৃতির পুনর্মিলন ও গৌরবের উৎসব। অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।